সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ১৯ জুলাই ২০১৮, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪২
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এবং রয়েল বেঙ্গল  টাইগারের আবাসস্থল সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ’৭৫ পরবর্তী শাসকরা সুন্দরবনের নদ-নদী, খাল ও চ্যানেলগুলো বন্ধ করে চিংড়ি চাষ প্রকল্প করায় এখানকার পানি লবণাক্ত হয়ে পড়েছিল। তার সরকার এই নদী এবং খাল পুনর্খনন করে নাব্যতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তা জাহাজ চলাচলের উপযুক্ত করে তুলেছে।

গতকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা ২০১৮ এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষ মেলা ২০১৮ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী ৩০ লাখ বীর শহীদের স্মরণে সারা দেশে একযোগে জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৩০ লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিরও উদ্বোধন করেন। দেশে প্রথমবারের মতো এই ধরনের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বনের দস্যুতা দূর করার জন্য আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের পুনর্বাসন এবং বনের অপরাধ দমনের উদ্যোগের পাশাপাশি সেখানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার জন্য সহ-ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প আয়েরও ব্যবস্থা করেছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. হাছান মাহমুদ বক্তৃতা করেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল্লাহ মহসিন চৌধুরী স্বাগত বক্তৃতা করেন।

প্রতিমন্ত্রী অনুষ্ঠানে পরিবেশ পদক ২০১৮ এর জন্য নির্বাচিত ব্যক্তি ও সংস্থা এবং বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন-২০১৮, বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০১৭ ও সামাজিক বনায়নের লভ্যাংশের চেক প্রাপ্তদের মাঝে পদক ও চেক বিতরণ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং আমাদের গর্ব রয়েলে বেঙ্গল টাইগারের ব্রিডিং পয়েন্ট উন্নত করা এবং এই রয়েল বেঙ্গল টাইগার যাতে সুরক্ষিত হয় তার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

’৯৬ সালে সরকারে এসেই ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদনের বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পানি চুক্তি করার পর আমরা সুন্দরবনের গড়াই নদী খননের কাজ শুরু করি। গড়াই নদী খননের ফলে সুন্দরবন অঞ্চলের লবণাক্ততা দূর হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই লবণাক্ততা দূর করা একান্তভাবে প্রয়োজন ছিল। কারণ, এই গড়াই নদীর হোগলা বন এলাকাটিই বাঘের ব্রিডিং পয়েন্ট। গড়াই, সালনাসহ সুন্দরবনের নদীগুলো খননের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, মিঠা পানির স্রোত যত বেশি হবে জলের লবণাক্ততা ততই কমে আসবে। সেজন্যই এই পদক্ষেপ আমরা নিচ্ছি।

সুন্দরবনের অভ্যন্তরে জাতির পিতার ঘাসিয়ার খাল খননের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই চ্যানেলটি বন্ধ করে পরবর্তীকালে ক্ষমতায় আসা শাসকগণ সেখানে চিংড়ি চাষের প্রকল্প গ্রহণ করে। ফলে জীববৈচিত্র্যের জন্য সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ এবং ডলফিনের আবাসস্থল সালনা নদীতে জাহাজ চলাচল শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘাসিয়ার খালের সঙ্গে সংযুক্ত প্রায় আড়াইশো ছোট ছোট খাল বন্ধ করে শুরু করা চিংড়ি চাষ বন্ধ করে চ্যানেলটি পুনরুদ্ধারে তাঁর সরকারকে বেগ পেতে হয়। তিনি বলেন, একে একে প্রায় সব খালের মুখ আমরা খুলে দিয়েছি।

যেগুলোর মধ্যে ৮০টা এখনও বাকি আছে এবং ঘাসিয়ার খাল পুনর্খনন করে সেখান দিয়েই জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। তাতে জাহাজ চলাচলের সময়ও বেঁচে যাচ্ছে। তা না হলে জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত ১৪/১৫ কিলোমিটার ঘুরে সালনা নদী দিয়ে আসতে হতো। এখন খুব সহজেই জাহাজগুলো মংলাবন্দরে চলে আসতে পারছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বলেন, সরকার বদল হলে, পরবর্তী সরকারের ভেতর যদি এই সচেতনতা না থাকে যে, কিভাবে দেশকে সুরক্ষিত করতে পারি বা দেশের পরিবেশ রক্ষা করতে পারি। তাহলে এই ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। তিনি বলেন, যারা ’৭৫ এর পরে ক্ষমতায় এসেছিল তাদের কাছে চিংড়ি চাষ করে পয়সা বানানোটাই সব থেকে বড় ছিল।

কিন্তু পরিবেশ বিনষ্ট হবে, জীববৈচিত্র্য’র সমস্যা হবে সেটা তারা কোনোদিনও ভাবেন নাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার দল যখনই ক্ষমতায় আসে দেশের পরিবেশ, দেশের মানুষের উন্নয়ন, দেশের অর্থনৈতিক এবং সার্বিক উন্নয়নের দিকেই দৃষ্টি দেয়া হয়। ১৯টি উপকূলীয় এলাকায় জেগে উঠা চরসমূহে সরকার উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী তৈরির জন্য ব্যাপক বনায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্য প্রাণীর অভয়াশ্রম ও মাছের প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করেছি। বনায়নের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগর থেকে ১ হাজার ৬০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ভূমি দেশের মূল ভূ-খণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাজীপুর জেলার শালবনে প্রায় ৪ হাজার একর ভূমিতে ২০১৩ সালে স্থাপিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক। চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী বিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণার দ্বার উন্মোচন করেছে এই পার্ক। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শেখ রাসেল এভিয়ারী ইকো-পার্ক। কক্সবাজার জেলায় ২০০১ সালে ৯০০ হেক্টর এলাকায় স্থাপিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক ডুলাহাজরা, কক্সবাজার যা এখন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। পলিথিন ও প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে সকলকে দেশীয় বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত পাটের পলিমার হতে প্রস্তুত পচনশীল সোনালী ব্যাগ ব্যবহারের আহ্বান জানান এবং সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় এবং সংস্থাসমূহকে প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যাগ উৎপাদনে এবং প্রচলনে উদ্যোগী হওয়ার অনুরোধ জানান।

এ বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আসুন প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করি : প্লাস্টিক পুনঃব্যবহার করি, না পারলে বর্জন করি,’ এর আলোকে প্রধানমন্ত্রী প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভাসমূহকে পুনঃব্যবহার এবং পুনঃচক্রায়ন এর উপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করার আহ্বান জানান। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, পলিসি ডায়ালগ এবং কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে কারো মুখাপেক্ষী না থেকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবিলায় নিজেদেরকেই উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সরকার প্রধান বলেন,  বৈশ্বিক উষ্ণায়নে আমাদের তেমন ভূমিকা নেই। কিন্তু বাংলাদেশেকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

সরকারের ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠনের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ইতিমধ্যে ৩ হাজার ৩শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও আমাদের এ সহায়তা অব্যাহত থাকবে। তিনি শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অংশ হিসেবে পরিবেশ অধিদপ্তরে ‘মনিটরিং এন্ড এনফোর্সমেন্ট’ কার্যক্রম জোরদারকরণ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এর জনবল বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সড়ক, অফিস-আদালত, সরকারি ভবন, পার্ক, নদীর তীর, লেক, খেলার মাঠ, কবরস্থানসহ পতিত, পরিত্যক্ত জমিতে, এমনকি বাড়ির ছাদে যথাযথ কৌশল অবলম্বন করে সবুজ এলাকার সংখ্যা বাড়ানো যায়।

তিনি বৃক্ষরোপণ করে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আসুন, আমরা প্রত্যেকে অন্তত একটি করে বনজ, ফলদ ও ভেষজ গাছের চারা রোপণ করি এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা নির্মাণে এগিয়ে যাই। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে, পরিবেশ পদক ২০১৮ এর জন্য নির্বাচিত ব্যক্তি ও সংস্থা এবং বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন-২০১৮, বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০১৭ ও সামাজিক বনায়নের লভ্যাংশের চেক গ্রহিতাদের অভিনন্দন জানান। শিল্প দূষণ রোধ করে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করে পরিবেশবান্ধব একটি সবুজ অর্থনীতির দেশ গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময় বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। এবারের জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০১৮ এর প্রতিপাদ্য ‘সবুজে বাঁচি, সবুজ বাঁচাই, নগর-প্রাণ-প্রকৃতি সাজাই’ এর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে শেখ হাসিনা আহ্বান জানান- ‘আসুন আমরা সবাই মিলে সবুজে-সবুজে দেশটা ভরিয়ে তুলি। প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম পার্শ্বে একটি ছাতিম গাছের চারা রোপণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ মেলা এবং বৃক্ষ মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

১৫ই আগস্ট জাতির জন্য শুধু শোকের নয়, লজ্জারও

সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৫০ ধনীর একজন বাংলাদেশের আজিজ খান

হলের সামনে থেকে ঢাবি ছাত্রী আটক

বাস অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা দ্বিতীয়

মানহানির মামলায় খালেদার জামিন

গোলাম সারওয়ারের দাফন কাল

মৃত্যুর এই কাফেলা বন্ধ হবে কবে?

ঢাকায় ন্যায় বিচারের খোঁজে

রাখাইনে যা দেখে এলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

হুইলচেয়ারে চলাফেরা করছেন নওশাবা

সিলেটে রাজু খুনের ঘটনায় মামলা

নতুন কলরেট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

বিএনপি নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে

বাংলাদেশের সব এজেন্সির জন্য মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার উন্মুক্ত

গুজব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে সরব হওয়ার আহ্বান ড. হাছান মাহমুদের

‘এ দেশের মাটি স্বৈরাচারের নয়’