১৫ই আগস্ট জাতির জন্য শুধু শোকের নয়, লজ্জারও

প্রথম পাতা

নূরে আলম সিদ্দিকী | ১৫ আগস্ট ২০১৮, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:৩৪
’৪৭ থেকে ৭১-এই দীর্ঘ পথপরিক্রমণে একেকটি আন্দোলনের সোপান উত্তরণের মাঝে একেক গুচ্ছ তরুণ তাজা তপ্ত প্রাণ অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। কিন্তু এই সবকিছুরই পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ প্রতীক ছিলেন জাতির জনক ও আমার প্রাণের মুজিব ভাই। আগস্ট মাসটি বাঙালি জাতির তথা বাংলাদেশের জন্য শোকের মাস। কিন্তু আমার জন্য এটি হৃদয়ের রক্তক্ষরণের মাস; অনুভূতি, উপলব্ধি ও মননশীলতার পরতে পরতে অসহ্য ও তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা বয়ে যাওয়ার মাস। আজকে ৪৩ বছর হলো, মুজিব ভাই আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আমার অনুভূতিতে, বিশ্বাসে এটা আজও পুরোপুরি সত্যরূপে প্রতিভাত হয় না। আমার মননশীলতা, অনুভূতি, হৃদয়ের  অনুরণন, কোন জায়গায় বঙ্গবন্ধু নেই বা তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন- এটা মানতে পারে না। আমার স্বপ্নের মধ্যে তো বটেই, জাগরণেও তার উপস্থিতির অনুরণন স্পষ্টভাবে উপলদ্ধি করি। এ এক অদ্ভুত অনুভূতি, এ অনুভূতি কোনো ভাষার মাধ্যমেই কাউকে বোঝানো যায় না।


নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে রাখি, দীর্ঘ কারারুদ্ধ জীবনের মধ্যে এক পর্যায়ে ১৭টি মাস প্রতিদিন এত দীর্ঘ সময় ধরে আমি যে তার নিবিড় সান্নিধ্য পেয়েছি, বাস্তবে কারাগারের বাইরে অথবা ভিতরে অনুজ তার অগ্রজের, সন্তান তার পিতার এত নিবিড় সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয় না। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী উদ্ধত উদ্‌গত পূর্ণায়ত পদ্মটির মতো উদ্ভাসিত যৌবনের অধিকারী। আজকের যুবকেরা সেটি অনুধাবন করতে অক্ষম, এটি আমি শতভাগ নিশ্চিত। তখন আমাদের পুরো জীবনটা চেতনার সমস্ত অংশটুকু রাজনীতির সমুদ্রের অতলান্তে নিমজ্জিত। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনের প্রেম-ভালোবাসা, চাওয়া-পাওয়া সবকিছুই ছিল রাজনৈতিক চেতনার গভীরে নিমগ্ন।

বাংলার স্বাধীনতা ছাড়া আমাদের কল্পনার আবর্তে আর কোনোকিছুই তখন দোলা দিত না। এই যে, স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধিকার, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরণ- এর অগ্রভাগে ছিলেন মুজিব ভাই। তিনি ছিলেন আন্দোলনের স্থপতি। তাঁর কালজয়ী নেতৃত্বকে ঘিরেই আবর্তিত হয় প্রতিটি আন্দোলনের স্রোতধারা। আর এই স্রোতধারার স্রষ্টা ছিল ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুকে বহুজনের মধ্য থেকে একক নেতৃত্বে প্রতিস্থাপিত করার পূর্ণ কৃতিত্ব ছাত্রলীগের। রাজনৈতিক চেতনা হিসেবে আমাদের চিন্তায়, মননশীলতায় সুরের মূর্ছনা তুলতো- “এ মাটি আমার সোনা, আমি করি তার জন্মবৃত্তান্ত ঘোষণা”,  “সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি যে আছে মাটির কাছাকাছি”, “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর”। অন্য যেকোনো সংগঠনের সঙ্গে এখানেই ছিল আমাদের রাজনীতিতে চেতনাগত পার্থক্য।

লাহোরে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে যখন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে আইয়ুবকে উৎখাত করার জন্য পাকিস্তানের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সর্বদলীয় কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নিতে চলেছিল, সেই সম্মেলনের প্রারম্ভে বঙ্গবন্ধু তখনকার পূর্ব-পাকিস্তান আজকের বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৬ দফা কর্মসূচিকে আন্দোলনের প্রধান কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করার দাবি তোলেন। এই কর্মসূচিটা তখনকার দিনে প্রশাসনে যারা বাঙালি ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন- সর্বজনাব আহমদ ফজলুর রহমান, রুহুল কুদ্দুস, শামসুর রহমান খান জনসন ভাই, অর্থনীতিবিদ নূরুল ইসলাম, রেহমান সোবহানসহ কয়েকজন প্রতিভাপ্রদীপ্ত সিএসপি অফিসার গ্রন্থনা করে চরম আস্থা ও প্রতীতির প্রতীক বাংলার মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে আপোষহীন, অকুতোভয়, দৃপ্ত চেতনার ধারক শেখ মুজিবের হাতে তুলে দেন।

শেখ মুজিব ৬ দফা প্রস্তাবটি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বদলীয় বৈঠকে উপস্থাপন করেন। মুজিব ভাই তখন এতটাই প্রদীপ্ত ও অকুতোভয় মানসিকতায় উজ্জীবিত ছিলেন যে, ৬ দফা স্বাধীনতার উপক্রমণিকা- এটি তাঁর প্রতীতি ও প্রত্যয়ে পরিণত হয়।
৬ দফা প্রদানের প্রাক্কালে তখনকার শেখ মুজিবুর রহমান এমনকি পূর্ব-পাকিস্তানেও অনেক নেতার মধ্যে অন্যতম ছিলেন। কিন্তু ৬ দফার দাবি উপস্থাপনের পর ছাত্রলীগের নিরলস ও নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলনের বিস্তীর্ণ পথপরিক্রমণের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগ তাকে বাংলার মানুষের হৃদয়ের সিংহাসনে মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

বঙ্গবন্ধুকে প্রাণের চাইতে বেশি ভালোবাসলেও আমি অস্বস্তি বোধ করি, যখন আজকের প্রজন্ম এবং তখনকার বুদ্ধিজীবী মহল, যারা বঙ্গবন্ধুকে নানাভাবে সিআই-এর দালাল, ভারতের অনুচর হিসেবে আখ্যায়িত করতেন, দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসি চাইতেন- তারাই আজকে বোল পাল্টে সর্বকালের সর্বনিকৃষ্ট চাটুকার হয়ে স্বাধীনতার একক কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে বন্দনা-অর্চনা করে সরকার ও আওয়ামী লীগে তাদের অবস্থানকে ক্রমাগতভাবে সুদৃঢ় করে চলেছেন। বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধৃতি দিয়েই আমি বলতে পারি, আমাদের প্রজন্মে আমার চাইতে স্নেহভাজন, বিশ্বস্ত ও প্রিয়পাত্র মুজিব ভাইয়ের আর কেউ ছিল না। ৩রা মার্চ পল্টন ময়দানে ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক ঘোষণা করে সভার সভাপতি হিসেবে দৃপ্ত শপথবাক্য পাঠ করাই। শাজাহান সিরাজ ইশতেহার পাঠ করেন। এখানে ছাত্রলীগ তো বটেই, ইত্তেফাক, তার সম্পাদক মানিক ভাই (তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া), বার্তা সম্পাদক শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেনের অনবদ্য সাহায্য-সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতাকে অস্বীকার করলে গোটা ইতিহাসটিই বিকৃত হয়ে যাবে।

আজকের রাজনীতির এই ডামাডোলের ক্রান্তিলগ্নে নতুন প্রজন্মকে অবহিত করা আমার নৈতিক দায়িত্ব, ৬ দফাকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানাতে গিয়ে ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ হয়েছিল। মানিক ভাইও কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। সর্বজনাব শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেন, মরহুম আসফ উদদৌলা রেজা, মাহমুদ উল্লাহ ভাইসহ অগণিত সাংবাদিক ও সংবাদপত্রকর্মী অনাহারে-অর্ধাহারে কী যে দুঃসহ যন্ত্রণার জীবন ইত্তেফাক বন্ধ থাকাকালীন কাটিয়েছেন, আজকে তা কল্পনা করাও কঠিন।

হাইব্রিড নেতারা তো বটেই, অন্য দল থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা সাইবেরিয়ান পাখিগুলো যারা বামধারার  রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিন্ন করে নৌকায় শুধু আশ্রয়ই নেননি, নৌকার মালিকই বনতে চলেছেন; আজকে শেখ মুজিবের রক্ত যাদের ধমনীতে প্রবাহিত- শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার সময় বয়ে যাচ্ছে, মস্কো, পিকিং, জাসদ, গণবাহিনী- তাদের সূক্ষ্ম  রাজনৈতিক কূটকৌশল ও ষড়যন্ত্রের জাল সিরাজ শিকদার বাহিনী ও গণবাহিনী কর্তৃক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ঈদের জামাতে সংসদ সদস্য কিবরিয়া ও রাজবাড়ীতে আরেক সংসদ সদস্য কাজী হেদায়েতকে হত্যা ১৫ই আগস্টের বেদিমূল রচনা করেছিল। জাসদ নেতৃত্ব এবং মস্কো-পিকিং-এর নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকে কী অশ্লীলভাবে কখনো জাতির পিতা না জুতার ফিতা, শেখ মুজিবের চামড়া দিয়ে ঢোল বানাবো, হাড্ডি দিয়ে ডুগডুগি বাজাবো- এ সমস্ত অশোভন ও নির্মম উক্তি করেছেন।

স্বাধীনতার পূর্বকাল হতেই বামেরা (ভ্রান্ত) বঙ্গবন্ধুকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে আসছিল। বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে তাদের সেই চেষ্টা সফল হয় এবং যত কষ্টদায়কই হোক এটা নির্মম বাস্তব, বাকশাল গঠন ১৫ই আগস্টের পটভূমিকা রচনায় অনেকটাই প্রণোদনা প্রদান করে। নেতা অবশ্য আমাকে ডেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আমি আমার মানুষকে বলেছিলাম, সাড়ে তিন বছর কিছুই দিতে পারবো না। তারা তা বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েছে। এখন আমি কী করে তাদের শান্ত রাখবো? তাই এখন একটা রেজিমেন্টেশনের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান একটা উন্নয়ন আনতে চাই। তারপর আবার বহুদলীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসবো, ইনশাআল্লাহ্‌। ১৫ই আগস্ট তাঁর সেই ওয়াদা পূরণ করার সুযোগ দেয়নি।  

মুজিব ভাইয়ের নেতৃত্বের যে আসন, সেটি মানুষের হৃদয়ে তিলতিল করে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। সে আসনটি ছিল মোগলদের হীরকখচিত ময়ূর সিংহাসনের চাইতেও মূল্যবান, অতুলনীয়। তাইতো প্রশ্ন এসে যায়, ১৫ আগস্টের পর সারা বাংলাদেশ আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো বিস্ফোরিত তো হলই না, বরং নীরব, নিথর, নিষ্পৃৃহ, নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল কেন? এই নিষ্পৃহতার কী কারণ- তার পূর্ণ বিশ্লেষণের ভার আমি ইতিহাসের কাছেই অর্পণ করতে চাই। তবুও আমার নিজের ধারণা, ঘটনার আকস্মিকতা এবং নৃশংস-নির্মমতায় সমগ্র জাতি হতচকিত হয়ে গিয়েছিল, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত- বাকশাল গঠন প্রক্রিয়ার প্রকোপে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। অনেক দল, বিশেষ করে ভ্রান্ত বামের সংমিশ্রণে আওয়ামী লীগ তার নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। ভাগের মা গঙ্গা পায় না- এমনই এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল সে সময়। অন্যদিকে, যাদের উপর সংগঠনসমূহের দায়িত্ব অর্পিত ছিল তারা সকলেই দায়িত্ব পালনে কেবল ব্যর্থই হননি, .
অনেকটা অস্বীকৃতি জানানোর মতোই ছিল তাদের নিস্পৃহতা। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, রক্ষীবাহিনী রাজনৈতিক নির্দেশের অভাবে সেনাবাহিনী হতে পরিত্যক্ত ২৬ জন ধিকৃত মানুষকে প্রতিরোধ করার জন্য এগিয়ে আসেনি।

বঙ্গবন্ধুকে অকালে হারানোর ক্ষতবিক্ষত আমার হৃদয়কে দীপ্তিহীন আগুনের শিখায় দগ্ধীভূত করে যখন একান্তে ভাবি, বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের গৃহটি আক্রান্ত হওয়ার পর দুই ঘণ্টার কাছাকাছি সময় তিনি হাতে পেয়েছিলেন। এই সময়ের মধ্যে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে এবং রক্ষীবাহিনীর যিনি রাজনৈতিক দায়িত্বে ছিলেন- তাদের সবার সঙ্গে টেলিফোনে বারবার পরিস্থিতি জানিয়ে সাহায্যের জন্য, অর্থাৎ ওদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। কিন্তু বারবার টেলিফোন করার পরও কারো কাছ থেকে তিনি কোনো সহযোগিতা পাননি শুধুমাত্র কর্নেল জামিল ব্যতিরেকে। আমি প্রত্যয়দৃঢ় চিত্তে মনে করি, সশস্ত্রবাহিনী ও রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তো বটেই, ন্যূনতমভাবে তাদের দেহরক্ষীদের নিয়ে বের হলেও দুষ্কৃতিকারীরা পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করার পথ খুঁজে পেতো না। কিন্তু দুর্ভাগ্য বঙ্গবন্ধুর, মর্মান্তিক শাহাদাতের পূর্বে তিনি বুকভরা বেদনা নিয়ে উপলদ্ধি করে গেলেন, তিনি কতটা একা, নিঃস্ব ও রিক্ত!

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর ডাকে যারা সাড়া দেননি, নিষ্ক্রিয়, নিষ্পৃহ ও নিস্তব্ধ থেকেছেন, তাদের শনাক্ত করে আওয়ামী লীগের মতো সংগঠন থেকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরে থাক, তাদের চিহ্নিত করে প্রতিবাদ ও জবাবদিহিতা পর্যন্ত চাওয়া হয়নি। বারবার সাহায্য চেয়েও নিষ্ফল হয়ে একাকীত্ব ও অসহায়ত্বের বেদনা নিয়ে বঙ্গবন্ধু মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আজও সেই গ্লানি থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। যারা নিষ্কলুষ চিত্তে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, তারা আজও কান পাতলে হয়তো ইথারে তাঁর বিদেহী আত্মার এই বেদনার ধ্বনি শুনতে পান।

১৫ই আগস্ট কোন সেনা-অভ্যুত্থান বা কোন বিদ্রোহ হয়নি। কোন জনতার বিপ্লবও সংঘটিত হয়নি। অন্যদিকে হত্যাকারীরা সংখ্যায় যে কেবল ২৬ জন ছিল তাই নয়, তাদের প্রায় সকলেই সামরিক বাহিনী হতে হয় বহিষ্কৃৃত, নয় চাকরিচ্যুত।

এখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য নয়, পরিস্থিতি ব্যাখ্যার প্রয়োজনে আমি উল্লেখ করতে চাই, ১৫ই আগস্টে আমার হৃদয়ের যে রক্তক্ষরণ, তা আজও বন্ধ হয়নি। এর প্রধানতম কারণ, তখন আমার হাতে কোন সংগঠনই ছিল না। ’৭১-এর ২৫শে মার্চ সারা বাংলাদেশ যখন পৈশাচিক শক্তি সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হল এবং কারফিউ জারি করে নির্বিচারে গুলি ছুঁড়ে নিরীহ নিরস্ত্র নিতান্ত সহজ সরল মাটির মানুষগুলোকে হত্যা করা হলো, তখন হৃদয়ের সমস্ত্র যন্ত্রণাকে প্রশমিত করে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করার সংকল্প ও পূর্ব পরিকল্পনাকে সামনে এগিয়ে নেয়ার প্রজ্বলিত আকাঙ্ক্ষাকে নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে রূপান্তরিত করি। কারণ, ২৫শে মার্চে আমার একহাতে ছিল বাঁশের বাশরি আর হাতে রণতূর্য। কিন্তু ১৫ই আগস্টে হৃদয়ে শুধু রক্তক্ষরণ হয়েছে, কিছুই করতে পারিনি।  
১৫ই আগস্টের কিছুদিন আগেও আমি যুবলীগের মহাসচিব ছিলাম। সেখান থেকেও আমাকে সুকৌশলে সরিয়ে দিলে (মনি ভাই এর বিপক্ষে ছিলেন) আমি শুধু নিষ্ক্রিয় ও নিস্তব্ধই হয়ে যাইনি, হয়তো ওই প্রতাপশালী অংশের কেউ আমাকে রক্ষীবাহিনী অথবা আততায়ী দিয়ে হত্যা করিয়ে তারা নিজেরাই শোকসভা, প্রতিবাদ সভা ও মিছিল করতেন।

আমার সুহৃদ, শুভাকাঙ্ক্ষীদের এমন হুঁশিয়ারির প্রেক্ষিতে আমি আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হই। সকল ধরনের সংগঠন থেকেই আমাকে বিযুক্ত করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর আমি ওইদিন ভোরে আমার পিতার টেলিফোনের মাধ্যমে জানতে পারি। আমি যে বন্ধুর বাসায় থাকতাম, তার টেলিফোন নম্বর কেবলমাত্র আমার পরিবারের সদস্যদেরই জানা ছিল। খবরটি শুনে পিঞ্জিরাবদ্ধ ব্যাঘ্রের ন্যায় বন্ধুর বাসায় ছটফট করছিলাম। মানসিক অবস্থা এমন ছিল যে, মন চাইছিল চিৎকার করে একাকী রাস্তায় বের হয়ে একাই প্রতিবাদ করতে থাকি। আমার বন্ধু ও তার স্ত্রী আমাকে নিবৃত্ত করার জন্য নানা ধরনের সান্ত্বনা ও প্রবোধ বাণী শোনাচ্ছিলেন। তাদের মূল কথা ছিল, ধৈর্য ধর, পরিস্থিতি পর্যালোচনা কর, বিশ্বস্তদের সাথে যোগাযোগ করো। যাদের সঙ্গেই যোগাযোগ করেছি, তারাই আমাকে ধৈর্যধারণ ও শান্ত থাকতে বলেছেন। অকষ্মাৎ এমন কিছু যেন না করি যেটি আত্মঘাতী ও অনর্থক বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে আমাকে ঠেলে দেবে। জীবনে আমি আর কখনো এতটা অসহায়বোধ করিনি।

বাকশালের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও ১৫ই আগস্টের পর আমাকে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘদিন ক্যান্টনমেন্টে তারপর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৯ মাস বন্দি করে রাখা হয়েছিল (রিট করে বেরিয়ে আসি)। আল্লাহ্‌র কাছে হাজার শুকরিয়া, আমার একটাই সান্ত্বনা এই যে, ১৫ই আগস্টে প্রতিরোধ গড়তে না পারলেও নেতার একান্ত বিশ্বস্ত সহকর্মী হিসেবে কারাভোগের মাধ্যমে নেতার প্রতি কিছুটা ঋণশোধ করতে পেরেছি। এবং সেদিন হতে আজ পর্যন্ত তাঁর চিন্তা-চেতনা, আদর্শ ও মননশীলতার বাইরে যেতে পারিনি। কোনো লোভ, প্রলোভন, প্রাপ্তি-প্রত্যাশা আমাকে আকর্ষণ করেনি।

নির্যাতন-নিগ্রহ আমার প্রতিবাদী চেতনাকে নিষ্প্রভ করতে পারেনি। প্রাণপণে চেষ্টা করেছি, গণতন্ত্রকে রক্ষা করার স্বার্থে বিভক্ত আওয়ামী লীগের বৃহত্তর অংশের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নেতার আদর্শকে তুলে ধরার জন্য কোনো পাথরই উল্টাতে বাকি রাখিনি। শেখ হাসিনা তখন দিল্লিতে প্রবাসী জীবনযাপন করছিলেন। ইতোমধ্যে জোহরা তাজউদ্দীন ও মালেক ভাইয়ের মধ্যে সভাপতি পদটি নিয়ে কোনোরকমের আপোষ-নিষ্পত্তি না হলে আরেকটি বিভক্তি রোধের লক্ষ্যে দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হলে ওই অংশের সংকট নিরসন হয়। তবে আশা করেছিলাম স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর শেখ হাসিনা দলকে একত্রিত করার জন্য একটি সক্রিয় ও বলিষ্ঠ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

হয়তো তাঁর পক্ষ থেকে বিবৃতি আসবে- বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে আমি ফেরত এসেছি। আমার অবর্তমানে যে বিভক্তি হয়েছে, আসুন আমরা একত্রে বসে সেই বিরোধ ও সংকটের নিরসন করি। কিন্তু তা তিনি কখনো করেননি। বরং সর্বজনাব ন্যাপের মহিউদ্দিন সাহেব ও আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে দলের মধ্যে আরেকটি বিভক্তি আসে। জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী অকষ্মাৎ ’৭৯ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং মই মার্কা গ্রহণ করতে সম্মতি প্রদান করেন। আওয়ামী লীগ মালেককে যখন নৌকা দেয়া হয়, তখন বর্ধিত সভায় প্রস্তাব নিয়ে দলীয় প্রধান জনাব মিজান চৌধুরীকে এর সর্বাত্মক বিরোধিতা এমনকি কোর্টের ইনজাঙ্কশন আনার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। কিন্তু মিজান ভাই এর কিছুই করেননি। যার কারণটি আজও আমার কাছে অজানাই রয়ে গেছে। নিবন্ধের কলেবর না বাড়িয়ে এখানে আমি বেদনাবিহ্বল চিত্তে এটুকু বলতে চাই, ১৫ই আগস্ট আমার কাছে শোকাবহ একটি দিনই রয়ে গেছে, প্রতিবাদের শানিত অস্ত্র হতে পারেনি।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

নির্বাচনী হলফনামায় ভুল তথ্য দিলে ব্যবস্থা নিবে দুদক

নির্বাচনের ইশতেহার প্রস্তুত করছে বিএনপি: আমীর খসরু

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আসিয়ানের পরবর্তী পদক্ষেপ কি?

প্রতি বছর দেয়া হবে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি সমাজকল্যাণ পদক’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা সাজা স্থগিত চেয়ে খালেদার আপিল

নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইইউ, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছতার প্রত্যাশা

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন যেনো প্রভাবিত না হয়

খাশোগি হত্যার রেকর্ড শুনতে চান না ট্রাম্প

লক্ষ্য ক্রাউন প্রিন্সকে রক্ষা করা!

ইসরাইলে আগাম নির্বাচন: হুঁশিয়ারি নেতানিয়াহুর

রোহিঙ্গারা ফেরত না যাওয়ায় মিয়ানমারে কৃত্রিম সন্তুষ্টি, ঢাকায় সমান হতাশা

এক বিশ্ববিদ্যালয়কেই ১৫০০ কোটি টাকা দান ধনকুবের ব্লুমবার্গ

সিরাজগঞ্জে অটোরিকশা চালক খুন

'আমি একজন স্বপ্নবিলাসী মেয়ে'

দ্বিতীয় দিনেও চলছে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশি বৃদ্ধাকে ঘরে ফিরিয়ে দিতে দুই দেশের হ্যাম রেডিও কাজ করছে