চমেক হাসপাতালের শতাধিক এসি ‘বৈদ্যুতিক বোমা’

দেশ বিদেশ

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম থেকে | ২৬ মে ২০১৯, রোববার
 সম্প্রতি দুই দফা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। গত ২০শে মে রাতে হাসপাতালের ষষ্ঠ তলায় ৩২ নম্বর (নবজাতক) ওয়ার্ডে এবং এর আগে ৩০শে এপ্রিল সকালে চতুর্থ তলায় ২১ নম্বর ওয়ার্ডে একটি অস্ত্রোপচার কক্ষে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
দুটো ঘটনাই ঘটেছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির শর্ট সার্কিট থেকে। ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করে আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারায় তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এতে বড় ধরনের বিপদ হতে রক্ষা পাওয়া গেছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন।
তিনি বলেন, চমেক হাসপাতালের শতাধিক এসি এখন বৈদ্যুতিক বোমায় পরিণত হয়েছে। যেখান থেকে যেকোনো সময় শর্ট সার্কিটের কারণে বড় ধরনের অগ্নিঝুঁকি রয়েছে। আর এমন দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মত দেন এই কর্মকর্তা।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহমদ অগ্নিঝুঁকির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, হাসপাতালে প্রায় ৬শ’ এসি রয়েছে।
এর মধ্যে গণপূর্তের কর্তৃত্বে স্থাপনকৃত এসির সংখ্যা ৪শ’। আর বাকি এসিগুলোর মধ্যে কিছু সংখ্যক এসি বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে ডোনেশন হিসেবে পাওয়া। এ ছাড়া হাসপাতাল প্রশাসন নিজ উদ্যোগেও কিছু সংখ্যক এসি স্থাপন করেছে বিভিন্ন ওয়ার্ডে। সবমিলিয়ে প্রায় ৬শ’ এসির মধ্যে ১শ’ এসি ব্যবহার অনুপযোগী। যা বর্তমানে জোড়াতালি দিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব এসি থেকে যেকোনো সময় শর্ট সার্কিট হতে পারে।
তিনি বলেন, পুরনো এসি প্রতিস্থাপনে প্রায় ৫০ লাখ টাকার বাজেট চেয়ে গত বছরের অক্টোবরে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবারও মুঠোফোনে মন্ত্রণালয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু অদ্যবধি এ সংক্রান্ত বাজেট পাওয়া যায়নি। বাজেট পাওয়া গেলে পুরনো এসিগুলো সরিয়ে ফেলা হবে। সেখানে নতুন এসি প্রতিস্থাপন করা হবে। এ ছাড়া সঞ্চালন লাইন সংস্কারেও উদ্যোগ নেয়া হবে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতালের এসি ও ফ্যানসহ বৈদ্যুতিক যাবতীয় বিষয় তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন গণপূর্ত বিভাগের (পিডব্লিউডি) উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রিক অ্যান্ড মেইনটেনেন্স) মাহমুদুল হাসান। তার অধীনে ৮/১০ জন ইলেকট্রিশিয়ান ও হেলপার কাজ করেন। যাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে হাসপাতালের এসিগুলো বৈদ্যুতিক বোমায় পরিণত হয়েছে।
অবশ্যই এ বিষয়ে পিডব্লিউডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রিক অ্যান্ড মেইনটেনেন্স) মাহমুদুল হাসান বলেন, দায়িত্বে অবহেলা ঠিক নয়। বরং হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বা স্থানে নতুন এসি স্থাপনের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম বা প্রক্রিয়া মানা হয়নি। বিশেষ করে ডোনেশন পাওয়া এসি স্থাপনে বৈদ্যুতিক যেসব সুইচ, সকেট ও সার্কিট ব্রেকার ব্যবহার করা হচ্ছে, তার বেশিরভাগই মানসম্মত নয়। অথচ, এসি স্থাপনে বৈদ্যুতিক এসব উপকরণ মানসম্মত হওয়া অপরিহার্য। কিন্তু নিয়ম না মেনেই এসব নতুন এসি লাগানো হয়েছে।
এ ছাড়া একটি সঞ্চালন লাইনে সর্বোচ্চ একটি বা দুটি এসি স্থাপনযোগ্য হলেও সেখানে প্রয়োজনের তাগিদে ৩/৪টি এসি স্থাপন করা হয়েছে। কোথাও কোথাও আরো বেশি। এতে করে সঞ্চালন লাইনে লোড বেড়ে গেছে অতিরিক্ত মাত্রায়। এর বাইরে প্রতিষ্ঠার পর হাসপাতালের বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনটি (অভ্যন্তরীণ) একবার মাত্র সংস্কার করা হয়। তাও ৯০ দশকে। অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে। এরপর লাইনটি আর সংস্কার করা হয়নি। সঞ্চালন লাইন কিংবা এসি-ফ্যান পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কাউকে ওয়ার্ডে দেখা যায়নি। আর এটি নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়, এমনটিও চোখে পড়েনি।
মাহমুদুল হাসান বলেন, এসিগুলোর শর্ট সার্কিটের কারণ হিসেবে ওয়ার্ড সংশ্লিষ্টদেরও দায় রয়েছে। ওয়ার্ডে ২৪ ঘণ্টা শুধুই নয়, মাসের ৩০ দিনে ৩০ দিন টানা এসিগুলো চলে। বলা যায়, এসিগুলো অন হয়, কিন্তু অফ হয় না। অথচ, এসিগুলোরও তো একটু রেস্ট দরকার। সেগুলো অফ করা হলো কি না, এটুকু তো অন্তত তদারকি করা দরকার।
তিনি বলেন, হাসপাতালে আমি যোগ দিয়েেিছ ৫/৬ মাস আগে। এর আগে ঠিক কী হয়েছে তা ভালোভাবে জানা নেই আমার। বর্তমানে চেষ্টা করছি। হাসপাতালের ওয়ার্ড সংখ্যার পাশাপাশি সেবার পরিধি বাড়ায় জনবলও বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৭ সালে। প্রতিষ্ঠার পর ১২০ শয্যা ও সীমিত আকারে আউটডোরে চিকিৎসা কার্যক্রমের মাধ্যমে সেবা চালু হয় এই চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানের। বর্তমানে ৪০টিরও বেশি ওয়ার্ড বিশিষ্ট এই হাসপাতালটি চিকিৎসা সেবায় গরিবের ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত। যার বর্তমানে অনুমোদিত শয্যা সংখ্যা ১৩১৩টি। কিন্তু প্রতিনিয়ত রোগী ভর্তি থাকছেন প্রায় তিন হাজার। প্রতি রোগীর সঙ্গে অ্যাটেন্ডেট হিসেবে থাকেন আরো এক বা দুজন করে। এ ছাড়া কয়েক হাজার রোগী প্রতিদিন আউটডোরে চিকিৎসা সেবা নেন। আর হাসপাতালে মোট চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২শ’ জন। নার্সের সংখ্যা প্রায় ৮শ’ জন। এর বাইরে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৫ শতাধিক। সবমিলিয়ে দৈনিক প্রায় ২০ হাজার মানুষের পদচারণা থাকে এই হাসপাতালে। এই বিশাল সংখ্যক জনসমাগম স্থলে বড় ধরনের কোনো অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলে সেটি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, চমেক হাসপাতালে তারা অগ্নি নির্বাপণের মহড়া করেছেন। আর এই মহড়ার কারণেই সবার মাঝে সচেতনতা এসেছে। যার সুফল দেখা গেছে সামপ্রতিক দুটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়। একটিতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আসার আগেই আগুন নির্বাপণ হয়। আর অন্য ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে অগ্নি দুর্ঘটনায় বড় ধরনের ঝুঁকি এড়াতে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছাড়া আরো কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য।
বিশেষ করে চমেক হাসপাতালের মতো জনবহুল সেবাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা খুবই জরুরি। কিন্তু ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছাড়া হাসপাতালে বাকি কোনো ধরনের ব্যবস্থা আছে কি না, তা সার্ভে করে বলা যাবে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে শিগগিরই হাসপাতালে এ সংক্রান্ত সার্ভে করা হবে বলে জানান তিনি।




এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

‘নিজের সঙ্গে যুদ্ধে জিতেছি’

রেকর্ড ম্যান সাকিব

এই লিটনকেই দেখতে চায় বাংলাদেশ

মারা গেলেন মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোরসি

বিরোধিতার মুখে ১৫ হাজার কোটি টাকার সম্পূরক বাজেট পাস

লাল-সবুজের ‘ফেরিওয়ালা’ বিলেতি নারী

‘যে’ কারণে রুবেল নয়, লিটন

স্বরূপে মোস্তাফিজ, ফর্ম জারি সাইফুদ্দিনের

ভাগ্নেকে ফিরে পেতে সোহেল তাজের সংবাদ সম্মেলন

বছরে বিশ্বজুড়ে আড়াই কোটি শরণার্থী পাড়ি দেন ২শ’ কোটি কিলোমিটার পথ

দুশ্চিন্তায় সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকরা

‘গণপিটুনির ভয়ে পলাতক ছিলেন’

ব্যাংকে টাকা আছে, তবে লুটে খাওয়ার মতো টাকা নেই

‘রোল মডেল’ হতে চায় সিলেট বিএনপি

ভুল করেই পাসপোর্ট সঙ্গে নেননি পাইলট ফজল

দেশে ফিরতে রাজি ভূমধ্যসাগরে আটকা ৬৪ বাংলাদেশি