সেই ঈদ আনন্দ...

দেশ বিদেশ

রাশিম মোল্লা | ১০ জুন ২০১৯, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৫৯
কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিন। যেদিনের ঈদ আনন্দ ছিল রঙিন আর ভালোবাসার মোড়কে মোড়া। ঈদের আগে নতুন শার্ট, জুতা আর ঈদগাহ্‌ ময়দানে যাওয়ার প্রস্তুতির আনন্দ এখন আর খুঁজেই পাওয়া যায় না। দল বেঁধে এ বাড়ি আর ওবাড়ি ঘুরে বেড়ানো এখন আর হয় না। অথচ আগে এটা ছিল ঈদ আনন্দের একটা বিরাট অংশ। ঈদ নামাজ শেষে নিজের বাড়িতে মিষ্টি মুখ করেই বেরিয়ে পড়তো দামাল ছেলেরা। শুরু হতো আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যাওয়ার পালা। দিন শেষে বিকালে হতো আড্ডা।
সন্ধ্যায় গ্রামবাসীকে বিনোদন দেয়ার জন্য নাটক ও যাত্রাপালাসহ নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। কিন্তু বর্তমানে ঈদে সচরাচর এসব আয়োজন দেখা মেলে না। আগের মতো কেউ কারো বাসায় তেমন একটা যায় না। এখন লোকজন বিনোদনের জন্য বেছে নিয়েছে টেলিভিশন আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। কথা হয় ঢাকার নবাবগঞ্জের বাউল শিল্পী মো. আজিজ ব্যাপারীর (৭০) সঙ্গে। তিনি বলেন, আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগে, ঈদে মজাই ছিল অন্যরকম। অনেক আগে থেকেই নাটক, যাত্রাপালার প্রস্তুতি নেয়া হতো। রিহার্সেল হতো। এরপর ঈদের দিন বিকালে শুরু হতো। সুস্থ্য বিনোদন ছিল। যাত্রাপালায় এখনকার মতো এতো অশ্লীলতা ছিল না। অনুষ্ঠান শেষ হতো মধ্যরাতে।
যারা ঢাকায় চাকরি করতেন। ঈদে বাড়ি ফেরার প্রধান বাহন ছিল লঞ্চ। হরেক রকম ঈদসামগ্রী নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। ব্যাংকার রানা ভূঁইয়া তার ফেসবুক টাইম লাইনে এভাবেই ঈদ স্মৃতি শেয়ার করেছেন বন্ধুদের সঙ্গে। তিনি লিখেছেন, আজকের সদরঘাটের ভিড় দেখে আশির দশকের ঢাকা-বান্দুরা লঞ্চের কথা মনে পড়ে গেল। ঢাকা সদর দক্ষিণ, যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল লঞ্চ। ঈদে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হতো বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই। টেলিফোন এতটা সহজ বিষয় ছিল না। যার যার বাসা কিংবা কর্মস্থলে গিয়ে বলা হতো ওমুক দিন দেশে যাবো চলে এসো। দেখা যেতো দল বেঁধে সদরঘাটে গিয়ে হাজির। কিংবা কারো সাথে যোগাযোগ না হলেও লঞ্চে পরিচিত কারো না কারো সাথে দেখা হয়ে যেতো। এভাবে লঞ্চে উঠে গল্প শুরু হতো, সেই গল্প আর শেষ হতো না। নানা পরিকল্পনার কথা শেয়ার করা হতো। দেশে গিয়ে কী কী করবো ইত্যাদি ইত্যাদি। সদরঘাটে বরিশাল, ভোলা, খুলনা, চাঁদপুরের বড় বড় স্টিমারের পাশে বান্দুরার মাঝারি ধরনের লঞ্চ দাঁড়িয়ে থেকে প্যাসেঞ্জার তুলতো। বাকি লঞ্চগুলো সদরঘাটের উল্টোদিকে ভিড়ে থাকতো। সদরঘাট থেকে যখন লঞ্চ ছেড়ে দিতো। তখন সদরঘাটের দু’পাশের বুড়িগঙ্গার নানা দৃশ্য চোখে ভাসতো। ঈদে কেনাকাটা শেষ করে সদরঘাটে আসার পর বর্ষা মৌসুমে কলা, আনারস, গেন্ডারি, আমড়া, পাউরুটি ইত্যাদি ক্রয় করে বাড়ির জন্য নিয়ে যেতো অনেকেই। লঞ্চে উঠেই মনে হতো কখন বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাবো। আনন্দে কখন সময় কেটে যেতো বুঝাই যেত না। সেই সারথী, মুন্নি-১, মুন্নি-২, হাজী-১, হাজী-২ লঞ্চে আমার মতো হাজারো যুবক যাত্রী দুলতে দুলতে যেতো মায়ের কাছে। কলাকোপা বান্দুরা পৌঁছতে সময় লেগে যেতো প্রায় ৬ ঘণ্টা। সেই ৬ ঘণ্টা লঞ্চ জার্নিতে একটু ক্লান্তিও অনুভব হতো না। বর্ষা মৌসুমে ঈদের সময় কেরাই নৌকা করে বাড়ি পৌঁছতাম। বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত মা বাবা অপেক্ষায় থাকতেন। ছেলে বাড়ি আসবে বলে দু’দিন আগে থেকেই প্রস্তুতি চলতো-ছেলেকে কী খাওয়াবে? ঈদের দু’দিনের মধ্যেই পুরো গ্রাম ভরে যেতো। সে কী আনন্দ। মহা আনন্দ। সেইদিনের সেই ঈদগুলোতে এখনকার মতো এতোটা জামাকাপড় পাওয়া যেতো না। তবে ঈদ আনন্দের এতোটুকুও কমতি ছিল না। বেশ কয়েকজন প্রবীনের সঙ্গে কতা বলে যানা যায়, আগের দিনে নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ কেনার সঙ্গে ছিল বইপত্র উপহার। প্রিয় মানুষগুলোকে ঈদ কার্ড বিতরণেরও ব্যবস্থা ছিলো। বর্তমানে এটি শহরে অফিস আদলতে বিদ্যমান রয়েছে সীমিত পরিসরে। ভোর থেকেই রান্নার ব্যস্ততা শুরু হয়ে যেতো। বর্তমানে অনেক পরিবারে আগের রাতেই রান্না করে ফেলে। ঈদের দিনের সেই রান্নার সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়তো চারদিকে। ভোরে গোসল শেষ করে নতুন পোশাক পরে ঈদগা গিয়ে নামাজ আদায় করার পর সকলের সাথে ঈদের কোলাকোলি শেষ করেই সেমাই-পায়েসের মিষ্টি সুস্বাদু খাবার সকলকে নিয়ে শুরু হত । তারপর শুরু হত অতিথিদের আগমন। এ মজা আজকাল যেন অনেকটা কমে গেছে। বর্তমান সময়ে ঈদের জামাত আদায় করার পর কোলাকুলি পর্ব শেষে খাওয়া দাওয়া করে অনেককেই টেলিভিশনের হরেক রকমের অনুষ্ঠান দেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেই দেখা যায়। নানা ব্যস্ততায় এখন আর আত্মীয়স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নেওয়া খুব একটা হয়ে ওঠে না। ঈদ উৎসবকে সামনে রেখে আয়োজন করা হতো নাটক, সংস্কৃতি অনুষ্ঠান, খেলাধূলা। প্রায় ৪/৫ দিন ব্যাপী উৎসবের সিডিউল তৈরি করা হতো। ফুটবল খেলা হতো সিনিয়র জুনিয়র, বিবাহিত অবিবাহিত ইত্যাদি দলে ভাগ করে করে। সেই খেলার মধ্যে একটি প্রাণ ছিলো। সেই প্রাণ খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক স্থানে ঈদ সামনে রেখে ম্যাগাজিন বের করা হতো।
কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম খেলাধূলা, নাটক ও সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের পরিবর্তে হোন্ডা ও ইজবাইক সহ নানান ধরনের যান বাহনে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মাধ্যমে ঈদ উৎসব পালন করে। প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা থাকলেও প্রাণ যেন খুঁজে পাওয়া যায় না। খাবারেও এসেছে পরিবর্তন। অনেক বাড়িতে এখন নুডুলস, চটপটি যুক্ত হচ্ছে। সাথে থাকছে পোলাও গরুর মাংস ও মুরগীর রোস্ট সহ সেমাই, পায়েস। সবকিছু মিলেই গ্রামীণ উৎসবে কৃত্রিমতা চলে এসেছে। যেটি আগে ছিলো না। এখন দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো এবং সেলফির মধ্যেই বন্দি থেকে ঈদ উৎসব। আক্ষেপের সুরে নবাবগঞ্জের খানেপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ঈদের এই আনন্দকে আরো প্রাণবন্ত করার জন্য প্রয়োজন দেশীয় সংস্কৃতির পুনরুদ্ধার করা। প্রতিটি গ্রামে গ্রামে কিংবা ক্লাবগুলোতে নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। এর সাথে যুক্ত থাকতে হবে নানা ধরনের খেলাধুলা। এটি কয়েকদিনব্যাপী করা উচিত। তবেই উৎসবগুলোতে সত্যিকারের প্রাণ খুুঁজে পাওয়া যাবে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

পদ হারালেন ওমর ফারুক

১০ বছর আমার চেহারা ভালো ছিলো এখন খারাপ হয়েছে: ওমর ফারুক চৌধুরী

যুবলীগের প্রস্তুতি কমিটি গঠন

সিঙ্গাপুরে রাজার হালে ক্যাসিনো ডন সাঈদ

মোহাম্মদপুরের সুলতানের পতন

ঢাবি অ্যালামনাই এসোসিয়েশনে কেন যেতেন জি কে শামীম

সম্রাটের অস্ত্র ভাণ্ডারের খোঁজ মিলেছে

পাক-ভারত সীমান্তে গুলির লড়াই

মেননের বক্তব্যে তোলপাড়

ঢাবিতে ফের ছাত্রদলের ওপর হামলা

খালেদা জিয়াকে দেখতে যাবেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা

মন্ত্রী হলে কি এ কথা বলতেন?

অবৈধ উপায়ে নির্বাচনে জয়ীদের কোনো বৈধতা থাকে না

সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব

ওয়াসার পানি সরাসরি পানের নিশ্চয়তা দিতে হবে

বাংলাদেশে এখন বিশ্বের আধুনিক আইটি সিস্টেম রয়েছে: জয়