কেন ইরাকের মতো সহজ প্রতিপক্ষ নয় ইরান?

বিশ্বজমিন

আলি রিজক | ১১ জুন ২০১৯, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:১৬
মার্কিন প্রশাসন ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে অনেক পর্যবেক্ষকই একটি অভিন্ন কথা বলেছেন। সেটি হলো ইরান আর ইরাক এক নয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে তার যে প্রভাব পড়বে, তা হবে ইরাক যুদ্ধের চেয়েও সুদূরপ্রসারী। যেমন, ইরাকের চেয়ে ইরানের সামরিক সামর্থ্য অনেক বেশি। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বহুগুণ ব্যয়বহুল হবে তার আরেকটি কারণ হলো, ইরানের আঞ্চলিক আদর্শিক মৈত্রী। যদি যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত বেধেই যায়, এটি নিশ্চিত যে, ইরানের সহায়তায় এগিয়ে আসবে তাদের আদর্শিক মিত্ররা। এই মিত্ররা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লেবানন থেকে ইরাক ও ইয়েমেনে।

এদের প্রত্যেকেই বিভিন্ন যুদ্ধে নিজেদের জাত চিনিয়েছে। তুলনামূলকভাবে, প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের আমলে ইরাকের তেমন কোনো আদর্শিক ‘সফট পাওয়ার’ ছিল না।
বরং, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ ও সাদ্দামের কুয়েত দখল করার চেষ্টার পর মধ্যপ্রাচ্যে রীতিমতো একঘরে হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
ইরানের এক নম্বর আদর্শিক মিত্র হলো লেবাননের হিজবুল্লাহ। ইরানেরই বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী এই সংগঠনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এ অঞ্চলে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা বাহিনীর একটি হিসেবে ধরা হয় হিজবুল্লাহকে। বিশেষ করে, ২০০৬ সালে লেবানন যুদ্ধে ইসরাইলকে ঠেকিয়ে দেওয়ার পর থেকে ব্যাপক সমীহ অর্জন করেছে এই বাহিনী। শুধু তাই নয়, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পক্ষে লড়াইয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে হিজবুল্লাহ। ফলে শুধু প্রতিরক্ষা নয়, আক্রমণেও দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আছে তাদের ঝুলিতে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে লেবানিজ এই সংগঠন যে বসে থাকবে না, তা প্রায় নিশ্চিত।

হিজবুল্লাহর নেতা হাসান নাসরাল্লাহ সম্প্রতি আল কুদস দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বক্তৃতায় বিষয়টি স্পষ্টও করে দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে ‘পুরো মধ্যপ্রাচ্য জ্বলবে।’ তিনি আরও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ধ্বংস হবে এবং মার্কিন দুই মিত্র সৌদি আরব ও ইসরাইলও বাদ যাবে না। পুরোপুরি না হলেও ইরাক ও ইয়েমেনেও এই হিজবুল্লাহ মডেল বাস্তবায়ন করতে পেরেছে ইরান।
ইরাকে বহুল আলোচিত ইরানি জেনারেল কাসেম সুলেমানির নেতৃত্বাধীন ‘আল কুদস ফোর্স’ প্রশিক্ষণ দিয়েছে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স (পিএমএফ)-কে। এই বাহিনী ইরাক থেকে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-কে হটাতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ইরাকে এখন ইরানের প্রভাব তুঙ্গে। দেশটির সরকার গঠন থেকে শুরু করে নানা নীতিগত বিষয়ে ইরানের ভূমিকা থাকে। ঠিক যেমনটা লেবাননে। শুধু পিএমএফ নয়। ইরাকে আসাইব আল হক, কাতাইব হিজবুল্লাহ ও বদর সংগঠনের মতো নানা ইরানপন্থী সামরিক সংগঠন রয়েছে।

অপরদিকে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণে সহায়তা দিয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহর সামরিক কমান্ডাররা। এই হুতি বিদ্রোহীরা ২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরবের আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়ছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী এখন তারাই। হুতি নেতা আবদুল মালিক বাদেরদিন আল হুতিকে প্রায়ই বলা হয় হাসান নাসরাল্লাহর ইয়েমেনি সংস্করণ।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলে আদর্শিক মিত্র দেশগুলো কী ধরণের আচরণ করতে পারে, তার একটি আভাষ পাওয়া যায় সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহে। ১৯শে মে যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, তখন বাগদাদের গ্রিন জোনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের নিকটেই একটি রকেট নিক্ষেপ করা হয়। তার কয়েক দিন আগে ইয়েমেনের হুতি বাহিনী সৌদি আরবের একটি তেল পাম্পিং স্টেশনে সশস্ত্র ড্রোন হামলা চালায়। এতে করে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকো একটি পাইপলাইন ব্যবহার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। ঠিক একই সময়ে সৌদি আরবের নাজরান শহরে বিমানবন্দরে টার্গেট করে হুতিরা।

ভবিষ্যতের যেকোনো লড়াইয়ে ইরানের এই আদর্শিক প্রভাব দেশটিকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলে অনেক মিত্র দেশ আছে, তবে কেউই আদর্শিক মিত্র নয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইল। সৌদি আরব ও আমিরাত যেন ওয়াশিংটনের ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’। ইয়েমেনে পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তার পরও সফল হতে পারেনি তাদের সামরিক বাহিনী। সবচেয়ে বড় কথা ইরান নিয়ে মতানৈক্য আছে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে। কাতারের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক, অপরদিকে কুয়েত ও ওমান এ বিষয়ে আরও নরম অবস্থান নিয়েছে। সুন্নি দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান ও তুরস্কও জানিয়েছে তারা কোনো ইরান-বিরোধী জোটে থাকবে না। অপরদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে ইসরাইলকে ব্যতিব্যস্ত রাখবে হিজবুল্লাহ।

এ অঞ্চলে ইরানের বিরুদ্ধে আদর্শিকভাবে লড়তে চায় এমন গোষ্ঠী হলো কেবল আইএস ও আল কায়েদা। এখানেও ইরানের সাফল্য আছে। ইরাকে পিএমএফ ও ইরান মিলে পরাজিত করেছে আইএসকে। সিরিয়ায় আইএস ও আল নুসরা ফ্রন্টকেও হটাতে ভূমিকা রেখেছে হিজবুল্লাহ। ইয়েমেনেও আল কায়েদার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য আছে হুতিদের। মোদ্দা কথা, এই আদর্শিক মৈত্রীর কারণেই ইরান এই অঞ্চলে অনেক বেশি শক্তিশালী।
(আলি রিজিক একজন লেবানিজ সাংবাদিক। তার এই নিবন্ধটি লোবলগ নামে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।)



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

সাইফউদ্দিনকে ছাড়াই কী খেলতে হবে?

রবিন হুডের শহরে বড় আশায় মাশরাফি

হঠাৎ বদলে গেল আয়াজের জীবন

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সংঘর্ষ চীনা শ্রমিক নিহত

আসামি সিরাজকে রিমান্ড শেষে কারাগারে প্রেরণ

৩০ লাখ শহীদকে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

শাজাহান খানের ভাইয়ের কাছে হারলেন নৌকার প্রার্থী

আন্দোলনে উত্তাল বুয়েট

কর্তৃত্ববাদী শাসনের অনিশ্চিত গন্তব্যে বাংলাদেশ

বাজেট নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর চান রুমিন ফারহানা

মসজিদে ঘোষণা দিয়েও ভোটার আনা যাচ্ছে না

২ স্কুলছাত্রীসহ ৫ কিশোরী ধর্ষিত

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হলেন টুকু-সেলিমা

সরকার কৌশল করে খালেদা জিয়াকে জামিন দিচ্ছে না: মির্জা ফখরুল

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের শাস্তি দেয়া হবে: কাদের

আমলা-কোহলির মধুর লড়াই