জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব জৌলুশ হারাচ্ছে কুয়াকাটা

দেশ বিদেশ

মোহাম্মদ ওমর ফারুক, পটুয়াখালী (কুয়াকাটা) থেকে | ১০ আগস্ট ২০১৯, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:২৩
কুয়াকাট বলতে ছিল ফায়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান। যেখানে ছিল শত শত বিভিন্ন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির গাছ। বাগানে দিনের আলোতেও বন্য শিয়াল, বানর ও অন্যান্য পশুর ভয়ে হাঁটতে ভয় করতো মানুষ। ছিল পাখির অভয়াশ্রম। পাখির কলকাকলিতে মুগ্ধ হতো যে কেউ। কিন্তু আজ সেই বাগানটিই বিলীন হয়ে গেছে। হাতেগোনা কয়েকটি নারিকেল গাছ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ এ বাগানটি নারিকেলকুঞ্জ নামে পরিচিত ছিল। কুয়াকাটার ইতিহাস-ঐতিহ্য ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। সাগরের ভাঙনে প্রাকৃতিক শোভা বাড়ানো জাতীয় উদ্যান এখন বিলীনের পথে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পূর্ব পশ্চিমে যেদিকেই দৃষ্টি যায়, সেদিকেই চোখে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। এক সময়ের সবুজের সমারোহে ভরপুর কুয়াকাটা সৈকতের সৌন্দর্য দেখে পর্যটকরা হারিয়ে যেত প্রকৃতির মাঝে। গত দশ বছর আগেও এমন চিত্র দেখা গেছে কুয়াকাটা সৈকতে। সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখন শুধুই ছবি। পর্যটন নগরী কুয়াকাটার সৌন্দর্য-মতি নারিকেল বাগানের পর এবার বিলুপ্তির পথে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান। আগত পর্যটকদের বিনোদন কেন্দ্র জাতীয় উদ্যানের অন্যতম আকর্ষণ ঝাউবাগানের ৭০ শতাংশ বর্ষা মৌসুমে সুমদ্র গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আগামী জো’তে বাকি অংশটুকুও সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন স্থানীয় জেলেরা। ঢেউয়ের ঝাপটায় ঝাউবাগানের শত শত গাছ উপড়ে পড়ে আছে সমুদ্র  সৈকতে। ফলে ভুতড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে ঝাউ বাগানের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবং সমুদ্রে তলদেশে পলি জমায় পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সাগরের বিশাল ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ছে। এ কারণে গত ১১ বছরে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানসহ সংরক্ষিত বনের অর্ধেকেরও বেশি ১ হাজার ১০০ একর বনভূমি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। এখন আছে ১ হাজার ৩০ একর বন। উপকূলীয় বন বিভাগের পটুয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কুয়াকাটায় বনের আয়তন ২ হাজার ১৬৫ দশমিক ৮০ একর। ২০০৫ সালে সরকার একে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে। পর্যটকদের কাছ আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে প্রাকৃতিক বনসংলগ্ন এ সৈকত ঘেঁষে ১০ হাজার হেক্টর ভূমির ওপর ঝাউ-বাগান গড়ে তোলা হয়। ২০১০ সাল থেকে এই বনে নতুন বাগান করা হয়। তবে ২০০৭ সালে সিডরের পর থেকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের ঝাপটায় ভাঙনে মুখে পড়ে বনাঞ্চল। প্রতিবছর কমপক্ষে ১০০ একর বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। ফলে কুয়াকাটায় পর্যটকদের বিনোদন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য তৈরি বনবিভাগের পর্যটনকেন্দ্র প্রায় সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। রক্ষার কোনো উদ্যোগ না থাকায় জাতীয় উদ্যানটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বসেছে। স্থানীয়দের মতে, কুয়াকাটা সৈকতের উন্নয়নে কাজ করছে পর্যটন করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও তদারকির অভাবে সব টাকাই ভেসে গেছে সাগরে। পটুয়াখালী উপকূলীয় বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, গত দশ পনেরো দিন আগে আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে চিঠি দিয়েছি। এ পর্যন্ত আমরা কোনো সাড়া পাইনি। যদি তারা কাজটা না করে তাহলে আমাদের দায়িত্ব দিলেও আমরা সেটা করে দিতে পারবো। পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি তাদের ফান্ড আমাদের দেয় তাহলে আমরা নিজেরাই কাজটা করে নিবো। আর নয় আমাদের মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করবো।
কুয়াকাট গিয়ে দেখা যায়, বর্তমান কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ৩-৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং কয়েকশ’ মিটার প্রস্থ সৈকত দৃশ্যমান। বর্তমান বর্ষায় মূল সৈকত দিনের আলোতে কয়েক ঘণ্টা জেগে ওঠে সাগরের ভাটায়। আর জোয়ার এলেই গোটা সৈকত তলিয়ে থাকে ৫-৭ ফুট সাগরের পানিতে। এদিকে অব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা না থাকায় দিন দিন পর্যটকদের আকর্ষণ হারাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় স্থান সাগরকন্যা কুয়াকাটা। এ কারণে ভরা মৌসুমেও পর্যটক কম হওয়ায় হোটেল-মোটেলসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় মন্দা নেমে এসেছে। তাছাড়া ২০১০ সালে কুয়াকাটাকে পৌরসভায় ঘোষণা করার পর পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য জমি বিক্রি ও ভবন নির্মাণ বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে থেমে গেছে ব্যক্তি উদ্যোগের নানা কার্যক্রমও। ফলে জমি কেনা-বেচার জটিলতার কারণেও আগ্রহ হারাচ্ছেন বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা। স্থানীয় বাসিন্দা শাহেদুল ইসলাম বলেন, কুয়াকাটা একটি অর্থনৈতিক জোন। অথচ সেই কুয়াকাটার সৈকতের উন্নয়নে নেয়া হচ্ছে না কোনো পদক্ষেপ। এ বছর সৈকত ভাঙার আতঙ্কে শুধু জিরো পয়েন্টে কিছু বালুভর্তি ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এসব বালুভর্তি ব্যাগও প্রায় বালুশূন্য হয়ে পড়েছে। এদিকে নানা সমস্যায় পড়ছে দেশি বিদেশি পর্যটকরা। থাকা, খাওয়া বা উন্নতমানের তেমন একটা হোটেল মোটেল না থাকায় পর্যটকরা পড়ছে ভোগান্তিতে। শুধু তাই নয়, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও ঘটে এখানে। অভিযোগ রয়েছে, এলাকার কিছু বখাটে লোকজন এসব অপকর্ম করে থাকে। বিশেষ করে পর্যটকরা যখন ভোরে এবং রাতে ঘুরতে আসে তখন তাদের নানানভাবে ফুসলিয়ে এবং জোর করে ছিনতাই করে থাকে। বরিশাল থেকে ঘুরতে আসা রাব্বি এজাজ নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, শুনেছি এখানে ছিনতাই হয়। তাই আমরা খুব সচেতন ছিলাম। তবে আমাদের সামনেও একটা ছিনতাই হয়েছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছিনতাইকারীরা ছোঁ মেরে নিয়ে চলে গেছে।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক তানভীর আহাম্মেদ সিদ্দিকী বলেন, কুয়াকাটা যতটা সৌন্দর্যপূর্ণ মনে করেছিলাম ততটা না। কুয়াকাট বিভিন্ন কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কুয়াকাটার স্থানীয় এলাকাবাসী দাবি করছে কুয়াকাটা বাঁচাতে সংশ্লিষ্টদের পদক্ষেপ প্রয়োজন। এ নিয়ে এলাকাবাসী অনেকবার রাস্তাও নেমেছে। কিন্তু কোনো ধরনের পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

খেলোয়াড় ও দর্শকদের প্রিয় কোচ হতে চান ডমিঙ্গো (ভিডিও)

ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন

প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিয়ে ঢাকা ছাড়লেন জয়শঙ্কর

কাশ্মীর ইস্যুতে আবার মধ্যস্থতার প্রস্তাব ট্রাম্পের

কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘের আদালতে যাবে পাকিস্তান

কারা হেফাজতে আইনজীবীর মৃত্যুর ব্যাখ্যা চেয়েছেন হাইকোর্ট

হঠাৎ গার্মেন্ট বন্ধ, আন্দোলনে শ্রমিকরা

ছাদ থেকে লাফিয়ে কারারক্ষীর স্ত্রীর মৃত্যু

এক রাতের জন্য ৪০ হাজার পাউন্ড প্রস্তাব

‘২১শে আগস্ট হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমান’

দেশে ফিরতে অনীহা রোহিঙ্গাদের

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে ৬১ এনজিওর ৪ সুপারিশ

২ মাসেও সন্ধান পাওয়া যায়নি হবিগঞ্জের সুমনের

লক্ষ্মীপুরে ব্যবসায়ীকে গলাকেটে হত্যা

বিয়ের ২২দিন পর একই রশিতে স্বামী-স্ত্রীর আত্মহত্যা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা স্থগিত করার আহ্বান হিউম্যান রাইটস ওয়াচের