চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির এক বছর

কোথায় মিলবে সেই প্রিয়মুখ

মরিয়ম চম্পা

শেষের পাতা ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:০২

স্বজনদের আহাজারি। চুড়িহাট্টা থেকে গতকাল ছবিটি তুলেছেন আমাদের আলোকচিত্রী জীবন আহমেদ
দেখতে দেখতে চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হচ্ছে কাল বৃহস্পতিবার। একরাতের অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান ৭৩ জন। এ ঘটনার পর নেয়া হয় বেশকিছু সিদ্ধান্ত। সেখান থেকে কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে ফেলার কথা বলা হয়। ক’দিন অভিযানও চলে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই আগের চিত্রই ফিরে আসে। আজও    বদলায়নি সেই মৃতত্যুকূপ ওয়াহেদ ম্যানশনসহ চক বাজারের চিত্র। স্বজনকে হারিয়ে ভালো নেই চুড়িহাট্টার আগুনে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।
পরিবারের উপার্যনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পড়ালেখা বন্ধ হয়েছে  ছেলে মেয়ের। কেউ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন। কেউ আবার প্রিয় সন্তান হারিয়ে অস্বাভাবিক যন্ত্রণায় দিন পার করছেন। সন্তানকে হারিয়ে সারাদিন জায়নামাজে পড়ে থাকেন দোলা-বৃষ্টি ও রোহানের মা। হাফেজ কাওসারের জমজ সন্তানেরা বাবার ছবি দেখে বাবাকে ডাকতে শিখেছে। মানবজমিনের সঙ্গে কথা হয় স্বজন হারানো পরিবারের।

চকবাজারে অগ্নিকান্ডে নিহত ঢাবি শিক্ষার্থী হাফেজ মো. কাওসার আহমেদের স্ত্রী মুক্তা বলেন, সবসময় তাকে মনে পড়ে। এই জীবনে কি ওর বাবাকে ভুলতে পারবো। দুই বাচ্চা জামিল আহমেদ কাফি ও মেহজাবিন সারার বয়স ২৩ মাস চলছে। সমপ্রতি ওরা নিউমোনিয়ার আক্রান্ত হয়েছিল। এখন ওদের শরীর কিছুটা দুর্বল। দুই বাচ্চা বাবার ছবি দেখে সারাক্ষণ বাবা বলে ডাকে। ওরা বাবার ছবি দেখে বুঝতে পারে এটা ওদের বাবা। এভাবেই হয়তো ছবির বাবাকে দেখে ওরা বড় হবে। বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাবার বাড়ি আছি। মাঝে মধ্যে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া হয় ওদের নিয়ে। একজন ভাই প্রতিমাসে আমাদের ১৫ হাজার টাকা করে খরচ দেয়। এবং ওর বাবার বন্ধুরা মাঝে মধ্যে সহযোগিতা করেন। এমনিতে ভালো আছি। আমি দাওরা (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেছি। ওরা বড় হলে হয়তো কিছু একটা করবো।

অর্থাভাবে পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার পথে চুড়িহাট্টার ব্যবসায়ী এ এস এম আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর দুই সন্তানের। স্ত্রী নাহিদা রহমান বলেন, ছেলে রাফিনুর রহামান মাহি (১৩) ও মেয়ে ফাহমিদা রহমান সাঞ্জু (৫) কে নিয়ে বর্তমানে বাবার বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে আছি। ওর বাবার ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনের ভবনেই ফার্মেসির ব্যবসা ছিল। সে একই সঙ্গে ফ্ল্যাক্সি লোডের ব্যবসাও করতেন। দোকানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ওষুধ ছিল। নগদ টাকা ছিল ৩ থেকে ৪ লাখ। ওর বাবাকে হারিয়ে আমরা পথে বসেছি। সে মারা যাওয়ার পর কয়েকমাস ধারদেনা করে ঢাকায় টিকে ছিলাম।

ছেলে একটি ভালো স্কুলে পড়তো। কিন্তু টাকার অভাবে ছেলেকে পড়ানো, বাসা ভাড়া ইত্যাদি দিতে না পেরে বাধ্য হয়ে বাবার বাড়ি চলে আসি। নোয়াখালীর স্থানীয় একটি স্কুলে ছেলেকে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি করেছি। ভাইয়েরা টুকটাক খরচ দিচ্ছে। এভাবে কতদিন চলতে পারবো জানি না। মেয়েটা ওর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে কেমন জানি হয়ে গেছে। পড়তে চায় না। কারো সঙ্গে বেশি কথা বলে না। ঘটনার আগে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ওর বাবা আমাকে বলেছিল তোমার হাতের চা খেতে খুব ইচ্ছা করছে। আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ হাসি ঠাট্টা করে বাসা থেকে দোকানে যায়। সেদিন ছেলেও তার সঙ্গে দোকানে ছিল। আগুন লাগার একটু আগে ছেলেকে জোর করে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। ফার্মেসিতে যে ডাক্তার বসতেন তাকেও বের করে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর নিজে বের হতে পারে নি। ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যত কি হবে কিভাবে বেঁচে আছি সৃষ্টিকর্তাই একমাত্র ভালো জানেন।     

অগ্নিকাণ্ডে নিহত রোহানের বাবা মো. হাসান খান ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পরেন। তিনি বলেন, ওর মা ছেলেকে সবসময় বুকের ভেতর আগলে রেখেছে। সেই ছেলেকে ছাড়া মা কেমন থাকতে পারে। সারাক্ষণ ছেলের ছবি, স্মৃতি আকড়ে পড়ে থাকেন ওর মা। ছেলে কি করতেন, কি ভালোবাসতেন, কিভাবে মাকে ডাকতেন সর্বক্ষণ এটাই ভাবেন। রোহান মারা যাওয়ার দুই মাস পর আমার মেয়ের বিয়ে হয়। চার ভাই বোনের মধ্যে রোহান বড় ছিল। ও মারা যাওয়ার আগেই মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। বোনের বিয়ে দেখে যেতে পারেনি। মেয়েটা ভাইয়ের জন্য খুব কান্না করে।

নিহত দোলার বাবা দলিলুর রহমান বলেন, সন্তানকে ছাড়া কোনো বাবা-মা ভালো থাকতে পারে? আমরা ভালো নেই। প্রতি মুহুর্তে মেয়েকে মনে পড়ে। বাঁচার জন্য হয়তো বেঁচে আছি। মেয়েকে হারিয়ে আমরাতো মৃত। সারাক্ষণ বুকের ভেতরটা হু হু করে। ওর মা ভুলবে কিভাবে। বৃষ্টির মা মাঝে মধ্যে আমাদের বাসায় আসেন। মেয়ের স্মৃতিচারণ করে পাগলের মত করেন। দুই মেয়ের মধ্যে দোলা ছিল বড়। ছোট মেয়ে এখন বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে পড়ে। বোন হারানোর শোকে পড়ালেখায় মন দিতে পারে নি। তাই পরীক্ষার ফলাফল ভালো হয় নি। মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পরেন দোলার মা সুফিয়া রহমান। তিনি বলেন, ঘুমাতে গেলে, রান্না করতে গেলে, খেতে গেলে সারাক্ষণই মেয়েকে দেখতে পাই। ওকে যে এক মুহুতের্র জন্যও ভুলতে পারিনা। এখন নামাজ পড়ে জায়নামাজে বসে আছি। মেয়ের জন্য দোয়া করছি। মেয়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে এতিম ছেলে মেয়েদের খাওয়ানো হবে।

বৃষ্টির ভাই সাইফুল ইসলাম সানি বলেন, প্রতি শুক্রবার আপুর কবর জিয়ারত করতে যাই। বোন ছিল একজনই। তাকেও হারিয়ে ফেলেছি। সে চলে গেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি হয়তো আপুর জন্য মিলাদ পড়াবে। এতবড় একটি অগ্নিকান্ডের পরও কোনো পরিবর্তন আসেনি চুড়িহাট্টায়। যেই কেমিকেল গোডাউন ছিল সেই আছে। যে ভবন থেকে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে তার মালিকদেরও শাস্তি হয়নি। বোনকে তো হারিয়েছি।

পটুয়াখালীর নিহত ভ্যানচালক শাহাবুদ্দিনের মা লাইলি বেগম বলেন, ছেলের বউ অসুস্থ। অনেকদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। মানুষের কাছ থেকে সাহায্য সহযোগিতা তুলে চিকিৎসা করিয়েছি। এখন তাকে বাবার বাড়ি নিয়ে গেছে। শাহাবুদ্দিনের তিন ছেলে। বড় ছেলের বয়স ১৪ বছর। অর্থাভাবে সে পড়ালেখা করতে পারেনি। সেও অসুস্থ। মেঝ ছেলে তৃত্বীয় শ্রেণিতে পড়তো। এখন খাবে নাকি পড়ালেখা করবে? তাই ওর চাচা ওকে একটি রুটির দোকানে কাজে দিয়েছে।

আপনার মতামত দিন



শেষের পাতা অন্যান্য খবর

বড় সংকটে শ্রমবাজার

২৭ মার্চ ২০২০

করোনা ভাইরাস নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল

দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে সংক্রমণ

২৭ মার্চ ২০২০

আতঙ্কের জনপদ নিউ ইয়র্ক

আরো চার বাংলাদেশির মৃত্যু

২৬ মার্চ ২০২০



শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত