করোনা ভাইরাস নজরদারিতে তছনছ ব্যক্তিগত গোপনীয়তা

মানবজমিন ডেস্ক

বিশ্বজমিন ২৪ মার্চ ২০২০, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:১১

করোনা ভাইরাসে যদি কেউ আক্রান্ত হয়ে যান, তাহলে তিনি কোথায় কোথায় গেলেন, কার কার সংস্পর্শে আসলেন, সেটি নির্ণয় করা গেলে রোগের বিস্তার ঠেকানো সহজ হয়ে যায়। আর দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার এ জন্যই সংগ্রহ করছে দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ, স্মার্টফোনের লোকেশন সংক্রান্ত ডাটা, ক্রেডিট কার্ডে ক্রয়ের রেকর্ড।
ইতালিতে নাগরিকদের মোবাইল ফোন থেকে উৎসরিত লোকেশন সংক্রান্ত ডাটা বিশ্লেষণ করছে কর্তৃপক্ষ। উদ্দেশ্য হলো, মানুষজন সরকারের লকডাউন নির্দেশ মেনে চলছে কিনা, তা পরখ করে দেখা। পাশাপাশি, প্রতিদিন চলাচলের ক্ষেত্রে দূরত্ব বজায় রাখছে কিনা, তাও দেখা হচ্ছে এভাবে। সরকার সম্প্রতি এই ডাটা বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষই দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটাচলা করছে না। এমন বেশ কয়েকটি দেশের নজরদারি প্রচেষ্টার চিত্র উঠে এসেছে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়, ইসরাইলে দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিগগিরই মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের বহু পুরোনো লোকেশন ডাটা ব্যবহার করা শুরু করবে।
উদ্দেশ্য হলো, কোন কোন নাগরিক নিজের অজান্তেই ভাইরাসের সংস্পর্শে চলে এসেছেন, তা নির্ণয় করা। অথচ, লোকেশন ডাটা সংগ্রহ করা হয়েছিল সন্ত্রাস প্রতিরোধে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে।
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস মহামারি। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডিজিটাল নজরদারি যন্ত্র ও উপায় ব্যবহার করছে সরকার। সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কাজে একেবারে গোয়েন্দা সংস্থার ব্যবহার করা প্রযুক্তিও এখন ব্যবহৃত হচ্ছে নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর।

স্বাস্থ্য ও আইন-প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এই ভাইরাস ঠেকাতে যা কিছু আছে তা নিয়েই লড়াইয়ে নামতে আগ্রহী হবেন, এটাই স্বাভাবিক। জননিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হয় তা এক্ষেত্রে নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। এখন মহামারি ঠেকাতে নজরদারি ব্যবস্থা বৃদ্ধি করা হলেও, পরবর্তীতে এই আড়িপাতা ও নজরদারি আরও ব্যাপক আকারে ব্যবহৃত হতে পারে। নাগরিক স্বাধীনতা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের কুখ্যাত সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক তা-ই হয়েছে। প্রথমে সন্ত্রাস দমনের কাজে নজরদারির কথা বলা হলেও, ধীরে ধীরে অন্য অনেক ক্ষেত্রেও নজরদারির বিস্তার বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে আমেরিকানরা পরে টেরও পেয়েছে।

২০০১ সালের পর এখন প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর হাতে এখন আরও আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি আছে। একেবারে নিখুঁতভাবে অবস্থান শনাক্ত করা থেকে শুরু করে চেহারা সনাক্তকরণ পদ্ধতি- অনেক কিছুই নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তগত হয়েছে। এসব প্রযুক্তি পরে অন্য কাজেও ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, অভিবাসী-বিরোধী নীতিমালা তৈরিতে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। নাগরিক স্বাধীনতা বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাষ্ট্র যখন এমন ভয়াবহ ক্ষমতা ডিজিটাল উপায়ে প্রয়োগ করে, তখন সেই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা বা প্রতিকার চাওয়ার পথ জনগণের খুব থাকে না।

ম্যানহাটানভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সার্ভেইল্যান্স টেকনোলজি ওভারসাইট প্রজেক্ট-এর নির্বাহী পরিচালক আলবার্ট ফক্স কান বলেন, ‘মহামারি ঠেকানোর জন্য আমরা খুব সহজেই স্থানীয়, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে এমন সব ক্ষমতা দিয়ে বসতে পারি, যেটা হয়তো আমেরিকার সামগ্রিক নাগরিক অধিকারকেই মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে দিতে পারে।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি এক্ষেত্রে নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাম্প্রতিক একটি আইনের কথা উল্লেখ করেছেন। এই মাসে পাস হওয়া এই আইনের মাধ্যমে এই ধরণের মহামারি ও হ্যারিক্যানের মতো রাজ্যব্যাপী দুর্যোগ বা সংকটের সময় গভর্নর অ্যান্ড্রু এম কুমোকে সম্পূর্ণ নির্বাহী আদেশে নিউ ইয়র্ক শাসন করার অসীম ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

এ মাসে অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক ডাক্তারকে ভৎর্সনা করেছেন এই বলে যে, তার মধ্যে করোনা ভাইরাসের লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও তিনি রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছেন। সঙ্গে ওই হাসপাতালের নাম বলে দেয়ায় ওই ডাক্তারের পরিচয় প্রকাশিত হয়ে যায়। ওই ডাক্তার পরে ফেসবুকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন।
ক্রিস জিলিয়ার্ড নামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিষয়ক স্কলার বলেন, ‘এই ঘটনা যে কারও সঙ্গে হতে পারে। হঠাৎ জানতে পারবেন যে আপনার স্বাস্থ্যের অবস্থা হাজার হাজার, এমনকি লাখ লাখ মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়ে পড়ছে। এটা বেশ আজব এক অবস্থা। কারণ জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে কথা বলতে গিয়ে আপনি আবার কারও কারও বিপদের কারণও হয়ে দাঁড়ান।’

তবে জাতিসংঘের গ্লোবাল পালসের ডাটা ও গভর্ন্যান্স বিষয়ক প্রধান মিলা রমানঅফ বলেন, জরুরী অবস্থার সময় জনগণের জীবন বাঁচানোর বিষয়টিকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিপরীতে দাঁড় করাতে হবে। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রান্ত নজরদারির কারণে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি কমাতে, সরকার ও কোম্পানিগুলোর উচিত ততটুকু ডাটা সংগ্রহ ও ব্যবহার করা, যতটা প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কত ডাটাকে যথেষ্ট বলা যাবে?
চীনের অবস্থা আরও ভয়াবহ। চীনের শ’ শ’ শহরে সরকার বলছে, নাগরিকদের স্মার্টফোনে অবশ্যই একটি সফটওয়্যার ইন্সটল করতে হবে। এই সফটওয়্যারে প্রত্যেক ব্যক্তিকে লাল, হলুদ বা সবুজ রঙ দেয়া হয়েছে। ওই ব্যক্তি থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কতটা, তা বিবেচনা করে ওই রঙ দেয়া হয়েছে। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমেই ঠিক করা হচ্ছে, কোন ব্যক্তিকে কোয়ারেন্টিনে যেতে হবে, কাকে সাবওয়ের মতো পাবলিক প্লেসে ঢুকতে দেয়া হবে, ইত্যাদি। কিন্তু সরকার ব্যাখ্যা করেনি যে, এই সফটওয়্যার কীভাবে কাজ করে। আর সরকারের এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার মতো ক্ষমতাও ছিল না নাগরিকদের।

সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রত্যেক করোনাভাইরাস রোগীর তথ্য অনলাইনে পোস্ট করেছে। অনেক সময় এই তথ্য ছিল অনেক বিস্তারিত আঙ্গিকে। যেমন, ওই রোগীর সঙ্গে কার সম্পর্ক আছে, ইত্যাদি তথ্যও ছিল। উদ্দেশ্য হলো, জনগণকে রোগীদের সম্পর্কে সচেতন করা। যেমন, একটি ক্ষেত্রে বলা হয়, কেইস ২১৯ হলেন ৩০ বছর বয়সী পুরুষ, যিনি সেংকাং ফায়ার স্টেশনে কাজ করতেন। তিনি বর্তমানে সেংকাং জেনারেল হাসপাতালে আছেন। তিনি কেইস ২৩৬-এর পারিবারিক সদস্য।
শুক্রবার সিঙ্গাপুরও নাগরিকদের জন্য একটি অ্যাপ চালু করেছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ বের করছে, কোন কোন ব্যক্তি ভাইরাসের সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন। যদি এই অ্যাপ ব্যবহারকারী কেউ আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে অ্যাপের লগ-ডাটা বিশ্লেষণ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানতে পারবে যে, তার সংস্পর্শে কারা কারা এসেছিলেন। ওই ব্যক্তিদের সেই তথ্য জানিয়েও দেয়া হবে। সরকারের একজন কর্মকর্তা বলছেন, এতে কারও গোপনীয়তা লঙ্ঘন হবে না, কেননা আক্রান্ত ব্যক্তির নাম বা পরিচয় অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা হবে না।

মেক্সিকোতে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান উবারকে জানায়, তাদের একজন যাত্রী এই ভাইরাসে আক্রান্ত। উবার ওই ব্যক্তিকে নিজেদের গাড়িতে চড়িয়েছেন, এমন দুইজন চালকের একাউন্ট বাতিল করে। পাশাপাশি, ওই দুই চালকের গাড়িতে চড়েছেন এমন ২০০ যাত্রীর একাউন্টও বাতিল হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রেও সম্প্রতি হোয়াইট হাউজ গুগল, ফেসবুক ও অন্যান্য টেক জায়ান্টদের কাছে জানতে চেয়েছে, সামগ্রিক লোকেশন ডাটা ব্যবহার করে এই ভাইরাসের জন্য জন-নজরদারি করা যাবে কিনা। কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য পরে প্রেসিডেন্টকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, নাগরিকদের ভাইরাস-সম্পর্কিত কোম্পানিগুলোর সংগৃহীত যেকোনো ডাটা সুরক্ষিত রাখতে হবে।

আপনার মতামত দিন

বিশ্বজমিন অন্যান্য খবর



বিশ্বজমিন সর্বাধিক পঠিত