গুজব, আতঙ্ক, পাকিস্তানে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা

মানবজমিন ডেস্ক

বিশ্বজমিন ৫ জুন ২০২০, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:৩৩

চিকিৎসকরা সতর্কতা দিচ্ছেন। বলছেন, পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এরই মধ্যে নাজুক অবস্থায়। খুব শিগগিরই করোনা রোগীতে ভরে যেতে পারে হাসপাতাল। এখন পর্যন্ত সেখানে মৃতের সংখ্যা ২০০০-এর চেয়ে সামান্য কম। প্রথমদিকে যে ভয়াবহতার আশঙ্কা করা হয়েছিল, ততটা এখনও হয় নি। কিন্তু নতুন সংক্রমণ এবং নতুন মৃত্যু এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় সেখানে লকডাউন প্রত্যাহার করা হয়েছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, বেশির ভাগ বড় হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
করাচি হলো দেড় কোটি মানুষের শহর। ডাটা বলছে, সেখানে হাতেগোনা কয়েকটি আইসিইউ বেড রয়েছে করোনা রোগীদের জন্য। লাহোরে একজন ডাক্তার বলেছেন, ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন ছিল এমন একজন রোগীকে দুটি হাসপাতাল ফিরিয়ে দিয়েছে। ওই রোগীকে এই ডাক্তারও ফিরিয়ে দিয়েছেন বেড খালি না থাকার জন্য। পেশোয়ার ও কোয়েটার মেডিকেল স্টাফরাও একই রকম চাপের কথা বলছেন। কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন কিছু হাসপাতাল রোগীতে পূর্ণ। তবে এখানে ওখানে অনেক বেড খালি আছে। তারা জনগণকে জানাচ্ছেন সেগুলো কোথায়। কিন্তু একই সময়ে নতুন নতুন চিকিৎসা ফ্যাসিলিটি নির্মাণ করা হচ্ছে করাচিতে। তবে চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন, জটিল অবস্থার রোগীর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। এ অবস্থায় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও অনাস্থার ফলে রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
কোয়েটার একজন শীর্ষস্থানীয় ডাক্তার বলেছেন, অনেক অসুস্থ মানুষ বাসায় অবস্থান করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। যখন তাদের অবস্থা একেবারে খারাপ হয়, তখনই তারা হাসপাতালে যাচ্ছেন। এ কারণে হাসপাতালে যাওয়ার পরপরই অথবা এম্বুলেন্সের ভিতরেই বহু রোগী মারা যাচ্ছেন। এসব রোগীকে চিকিৎসা দেয়ার সুযোগটুকুও পাচ্ছেন না চিকিৎসকরা। এতে স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে যেমন উদ্বেগ আছে, তেমনি পরিবারের সদস্যরা কোয়ারেন্টিন মানতে অনীহা প্রকাশ করেন। উদ্ভট বিষয় হলো গুজব। নানা রকম গুজব বাতাসে। তাতে বলা হয়, মৃত ব্যক্তিকে মিথ্যে করোনা রোগী ঘোষণার জন্য চিকিৎসদের অর্থ দিচ্ছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। করাচির একজন চিকিৎসক বলেছেন, তাকে সম্প্রতি তার একজন বন্ধু মেডিকেল পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমার ছেলের ফ্লু ও জ¦র হয়েছে। আমি তাকে হাসপাতালে নিতে চাই না। কারণ, প্রতিজন জ¦র আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসকরা কোভিড-১৯ আক্রান্ত বলে ঘোষণা দিচ্ছেন।এ ছাড়া তারা প্রতিটি ঘটনায় ৫০০ রুপি করে নিচ্ছেন।

এ কথাটা হাস্যকর শোনায়। কিন্তু এর ভয়াবহ এক পরিণতি আছে। রোগীর পরিবারের সদস্যরা করাচি, পেশোয়ার ও লাহোরের হাসপাতালের স্টাফদের ওপর হামলা করেছে। মৃত এক রোগীর লাশ তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর না করায় একদল লোক করাচির জিন্নাহ পোস্টগ্রাজুয়েট মেডিকেল সেন্টারের একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড ভাঙচুর করেছে। পাকিস্তানে কেউ মারা গেছে ইসলামিক প্রথা অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব লাশ দাফ করা হয়। তাতে যোগ দেন বহু সংখ্যক মানুষ। কিন্তু করোনা ভাইরাসে কেউ মারা গেলে বা করোনা সন্দেহজনকভাবে কেউ মারা গেলে এর কোনোটিই মানা হচ্ছে না। এই হাসপাতালের একজন শীর্ষস্থানীয় ডাক্তার ইয়াহিয়া তুনিও। তিনি বলেন, মেডিকেল স্টাফরা একই সঙ্গে করোনা ভাইরাস এবং অবহেলার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।
মায়ো হাসপাতাল লাহোর-এ কাজ করেন ডাক্তার জামাল আওয়ান। সম্প্রতি কয়েকটি সহিংস ঘটনার পর তার হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। সচেতনতার অভাব এসব সহিংসতার কারণ। এ ছাড়া আতঙ্ক রয়েছে যে, চিকিৎসকরা গোপনে বিষাক্ত ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করে রোগীদের মেরে ফেলছে। এখানে এক পরিবারকে বলা হয়েছিল, তাদের কাছে ভেন্টিলেটর সমৃদ্ধ আইসিইউ বেড খালি নেই। পরিবারের সদস্যরা যে রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তার অবস্থা ছিল সঙ্কটজনক। ফলে ঘটনার পর পরই তিনি মারা যান। এ সময় ডিউটিতে ছিলেন চিকিৎসক অমরা খালিদ। তিনি বলেছেন, আকস্মিকভাবে ২০ থেকে ৩০ জনের একটি দল হাসপাতালের স্টাফদের ওপর হামলা করে। তাদের কেউ কেউ চিৎকার করে বলতে থাকেন, যদি করোনা ভাইরাস সত্যি হয়, তাহলে আপনারা অসুস্থ হচ্ছেন না কেন?
অমরা খালিদের স্বামীও একজন ডাক্তার। তিনি ওই সময় ডিউটিতে ছিলেন। হামলাকারীরা তাকে ধাক্কাতে থাকে ওয়ার্ডের ভিতর। কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই রোগীর সিপিআর করতে বাধ্য করেন তারা। তাই ডাক্তার খালিদ এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে, স্টাফদের নিরাপত্তা বাড়াতে এবং রোগীর আত্মীয়দের হাসপাতালে প্রবেশে বিধিনিষেধ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ডাক্তার অমরা খালিদ বলেন, ঘটনার আকস্মিকতায় আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এমনকি আমি চাকরিটা ছেড়েই দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারি নি। ভাবলাম, যদি সবাই চলে যাই, তাহলে কে সেবা দেবে?
প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানে কয়েক শত ডাক্তার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে কমপক্ষে ৩০ জন স্বাস্থ্যকর্মী মারা গেছেন। পেশোয়ারে একটি বড় হাসপাতালের গাইনি বিভাগের একজন স্টাফের করোনা পজেটিভ ধরা পড়ায় ওই বিভাগ অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। হাসপাতালটির একজন চিকিৎসক বলেছেন, তার প্রায় ১০০ সহকর্মী করোনা পজেটিভ। তাদের সবাই করোনা রোগীকে চিকিৎসা করেছেন এমন না। তিনি আরো বলেন, নিরাপত্তা সরঞ্জামের লেভেল উন্নত করা হলেও তাদেরকে মুখ সুরক্ষা রাখার সরঞ্জাম (ফেস শিল্ড) সহকর্মীদের সঙ্গে শেয়ার করতে হয়। এক শিফটে ব্যবহৃত ফেস শিল্ড পরের শিফটের সহকর্মীরা ব্যবহার করেন। যেসব স্টাফ সরাসরি করোনা রোগীদের সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে একেবারে সামনের সারিতে নেই তাদেরকে কিট হস্তান্তরে ঘাটতি আছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ফলে এসব স্টাফ ওইসব মানুষদের ভিতর দিয়ে চলাফেরা করতে বাধ্য হচ্ছেন, যাদের করোনা পরীক্ষা করাই হয় নি।
গত মাসে লকডাউনে বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে আরো খারাপ অবস্থা সামনে অপেক্ষা করছে বলে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেক চিকিৎসক। লাহোরের মায়ো হাসপাতালে কাজ করেন ডা. রিজওয়ান সাইগল। তিনি বলেছেন, করোনা মহামারি শুরুর দিকে করোনা আক্রান্ত পরিবারগুলোর ভেন্টিলেটরের জন্য আকুতি দেখেছেন। তিনি বলেন, এখন পরিস্থিতি আরো ভীতিকর। যদি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেই থাকে, তাহলে হাসপাতালগুলো সয়লাব হয়ে যাবে রোগীতে। কারণ, আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে আইসিইউ অথবা ভেন্টিলেটর নেই।
প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান লকডাউন তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে যুক্তি দেখিয়েছেন দেশে যেসব মানুষ দিন এনে দিন খায় তাদের করুণ পরিণতি। তার ভাষায়, দেশে শতকরা ২৫ ভাগ মানুষ বসবাস করছে দারিদ্র্যসীমার নিচে। এর অর্থ হলো দেশে ৫ কোটি মানুষ আছেন, যাদেরকে আমরা দিনে দু’বেলা খাবার দিতে সক্ষম হচ্ছি না। উহান বা ইউরোপের মতো যদি লকডাউন আমরা বাস্তবায়ন করি, তাহলে এসব মানুষের কি হবে?
ইমরান খান জনগণকে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। জনসমক্ষে বের হওয়ার সময় মুখে মাস্ক পরতে বলেছেন।

আপনার মতামত দিন

বিশ্বজমিন অন্যান্য খবর



বিশ্বজমিন সর্বাধিক পঠিত