টিভি টকশো: মর্মভেদী দৃশ্য

শহীদুল্লাহ ফরায়জী

মত-মতান্তর ২০ জুলাই ২০২০, সোমবার

শহীদুল্লাহ ফরায়জী
বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়া তথা টিভি টকশোর সৌজন্যে প্রতারক শাহেদ করিমের বাগাড়ম্বর জাতিকে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। আত্মমর্যাদা সম্পন্ন একটি রাষ্ট্রের জন্য এটা খুবই মর্মান্তিক দৃশ্য, খুবই বেদনাদায়ক ও মর্মভেদী দৃশ্য।

যে শাহেদ করিমের কারণে অগণিত জীবন লন্ডভন্ড হয়েছে, করোনায় মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, এবং পরীক্ষাবিহীন করোনার ভুয়া সনদে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মর্যাদা ধুলোয় মিশেছে সেই শাহেদ করিম কি করে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হয়ে টিভি টকশোতে অংশগ্রহণ করে জাতির পরিত্রাতা হয়ে বক্তব্য দিয়েছে দিনের পর দিন।
টিভি টকশোতে অংশগ্রহণের যোগ্যতা কিভাবে শাহেদ করিম অর্জন করেছিল তা টকশো কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই জাতির কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে। শাহেদ করিমকে টকশোতে নেয়ার জন্য কি কোন ঐশ্বরিক বার্তা ছিল বা শাহেদ করিম কি তার টকশোর প্রযোজক বা উপস্থাপকদেরকে বলপ্রয়োগে জিম্মি করেছিল? শাহেদ করিমকে টিভি টকশোতে না নিলে টেলিভিশনগুলোর 'গর্ব' 'ও 'সম্মান' কি ঝুঁকিতে পড়ে যেত? টকশোগুলো কি দর্শকশূন্য হয়ে পড়তো? শাহেদ করিমকে টকশোতে নেয়ার বাধ্যবাধকতা কিভাবে সৃষ্টি হল?
টকশোতে অংশ নেয়ার কারণে তার উচ্চমাত্রার প্রভাব ও ওজন বাড়িয়ে বড় প্রতারণার অনুঘটক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার দায় কে বহন করবে? প্রথম শ্রেণীর টকশোতে শাহেদ করিমের বারবার উপস্থিতি তাকে যে সমাজে প্রশংসনীয় ও গৌরবময় করে দিয়েছে এবং প্রতারণার উচ্চশিখরে আহরণের সুযোগ করে দিয়েছে তার দায় কে নেবে? টিভি টকশো যে শাহেদ করিমের অভিলাষ পূরণে সহায়ক হয়েছে তার দায় কে নেবে?

শাহেদ করিমদের মত প্রতারক অপরিনামদর্শী ব্যক্তিদের দর্পিত পদভারে সমাজ যে অন্ধকার ও দুঃখের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে এজন্য কি আমাদের কোন দায় নেই ! টিভি টকশোর সৌজন্যে আমরা যাকে দেখলাম মানবতা ও মহত্বের সর্বোচ্চ স্তরে উঠে গেছে আবার পরবর্তীতে যখন তাকেই দেখলাম হীনতা, বর্বরতার সর্বনিম্ন স্তরের তখন সমাজের মননে কি ধরনের প্রতিক্রিয়া হয় তাকি গণমাধ্যম উপলব্ধি করতে পেরেছে? এই যে সমাজ ও রাষ্ট্র অধঃপতনের খাদে পড়ে গিয়েছে তাতে নাগরিক হিসেবে আমাদের কি কোনো দায় নেই? নাগরিকের দায় ছাড়া কোন রাষ্ট্র কি বিনির্মাণ হতে পারে?

শাহেদ করিমকে সরকার গ্রেপ্তার করেছে এবং জালিয়াতি প্রতারণা উন্মোচিত করছে, সর্বোপরি বিচারের আওতায় এনেছে। সেই শাহেদ করিমকে জাতীয় ব্যক্তিত্বে রুপান্তর করার উদ্যোগ যে ভুল ছিল তার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন দুঃখ, কোন অনুতাপ কি প্রকাশ করেছে? শাহেদ করিম এর ঘটনায় শুধু কি জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গণমাধ্যম কি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই? এ ঘটনা আত্মমর্যাদা সম্পন্ন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বদের টকশোতে যাওয়া কি নিরুৎসাহিত করবে না? টকশো দেখলেই কি মনে পড়বে না পাকা দাগি অপরাধী শাহেদ করিমের কথা? এতে জাতীয় গণমাধ্যমের উপর জনগণের নূন্যতম আস্থার বিলোপ ঘটবে কিনা, দর্শক বিমুখ হবে কিনা? এ গুলো কি আমরা কখনো তলিয়ে দেখেছি?

শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে আমরা অন্যায় করেও নিরাপরাধ, নিষ্কলঙ্ক, রাজকীয় গুণের অধিকারী হয়ে থাকবো আর সমাজের মানুষ আপনা আপনি সাধু সুনীতিসম্পন্ন কর্তব্যপরায়ণ মহান আদর্শস্থানীয় হয়ে উঠবে এটা কোন বিবেক সম্পন্ন বিবেচনা নয়।

সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব এবং সেনাবাহিনীসহ পুলিশের ন্যায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জড়িয়ে শাহেদ করিম উন্মাদের মতো যেসব বক্তব্য দিয়েছে সেগুলোর একটাও গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার উপযোগী ছিল না। কিন্তু শাহেদের বেলায় কোন বাধাবিঘ্ন ছাড়াই তা প্রচারিত হয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিরোধী, জনশৃঙ্খলা বিরোধী বক্তব্য দেখার কোন প্রতিষ্ঠান কি ছিল না?

সংবিধানের ৩৯ (২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জনশৃঙ্খলা শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা মানহানি অপরাধ সংঘঠনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের ধারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে শাহেদ করিমের জন্য যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ কেন প্রয়োগ করা হয়নি। কেন মিডিয়া তার বক্তব্য বাতিল করার নৈতিক সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেনি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জনশৃঙ্খলা শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে সাংবিধানিক বিধি নিষেধ শাহেদ করিমের বেলায় কেন প্রযোজ্য হয়নি তার ব্যাখ্যা জাতির সামনে অবশ্যই উপস্থাপন করা উচিত। নইলে এ সব দূর্বলতার সুযোগে যে কোন মুহূর্তে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, জনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে।

রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণে আমাদেরও যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে, আমরা সবাই তা ভুলতে বসেছি। শাহেদ করিমকে নিয়ে এত বড় জাতীয় দুর্ঘটনা ঘটার পরও আমাদের কি টনক নড়েছে? এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কর্তব্য হবেঃ (১) জাতীয় গণমাধ্যমের টকশোতে এখনো শাহেদের মত প্রতারকদের উপস্থিতি রয়েছে কিনা তা দ্রুত চিহ্নিত করে অপসারণ করা, (২) শাহেদের অংশগ্রহনে যত টিভি টকশো হয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে তা থেকে শাহেদের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ বা প্রত্যাহার করা। এর মাধ্যমে গণমাধ্যমের দায় মোচনের উদ্যোগ গ্রহন করা, (৩) ভবিষ্যতে শাহেদের মত প্রতারকরা যাতে টকশোতে স্থান না পায় তা/ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করা, (৪) গণমাধ্যম, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাক্ স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা।

কতো বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত হলে আমাদের বিবেক জাগ্রত হবে, অধঃপতনের কোন্ পর্যায়ে নেমে গেলে আমাদের আত্মোপলব্ধি হবে?

লেখক: গীতিকার
২০ জুলাই ২০২০.

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

২০২০-০৭-২০ ২০:১৩:১২

মক্কাতে খুবই সুন্দর ভালো। কিন্তু সরকার সাহেদ করিমকে দলীয় আন্তর্জাতিক উপকমিটির সদস্য করেছে যার প্রমাণ ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সে বিষয়ে কোনো কিছু লেখা হয়নি। কাজেই লেখাটি অসম্পন্ন।

Khokon

২০২০-০৭-২০ ০৯:৫৭:৩১

The writer wrote everything is right but who will do the justice ? Who will abandon him ? Every body is looking for money whether good or ugly ? Around to goververment people were put their hand to stayer Sahed going up and now they're silent and don't think they will come out and say sorry for they have been done ? Now, if Sahed getting justice for his work, at least people can get some relief other wise the pain will remain with them always !!

Adv goutam Chakrabo

২০২০-০৭-২০ ০৮:৫৭:০৬

সঠিক কথা।

aqa md fazlul haque

২০২০-০৭-২০ ২০:০৮:১৯

Not Shahed, culprits are his promoters. Identify promoter tv anchors and expose them and bring them under legal proceedings. if not, hundreds of Shahed will be created. Many criminals (bank looters and corrupt ministers) were brought to the talk show after 1-11 .........................

Shafiur Rahman

২০২০-০৭-২০ ০৭:০৫:২৬

The problem is we the Bengali people is so Simple and all of these Culprits taking the chance .Bangladesh was not born for this Culprits.All is open secret now so why we do waist our time and why we do not give them on Firing Sc.

সুবোধ

২০২০-০৭-২০ ০৬:৫৩:৫২

বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর টক শো বর্জন করেছি অনেক আগেই।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

গণধর্ষণের নেপথ্যে

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

ঐতিহ্য হাইজ্যাকের পর ধর্ষকের আস্তানা

নারী, মাদকই ওদের নেশা

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

তাহলে সিইসি কবুল করলেন

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

ভিপি নুর, ধর্ষণ এবং আট মাস

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

ড্রাইভার মালেকের বালাখানা

দরজা আছে, দরজা নেই

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

আ/ম/ব/য়া/ন

একটি স্বপ্নের চাকরি এবং...

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

রাজনীতিতে কোরাসবাজি

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

পিয়াজ কথন

ভারতের অনুতাপ এবং দোজখপুর

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

চীন-ভারত দ্বন্দ্বের নেপথ্যে

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

বয়াতির আসর আর রাজনীতির মঞ্চ

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত