এয়ারপোর্টে ২৭ ঘণ্টা আটক থাকার ঘটনা আমার জীবন বদলে দিয়েছিল

কাজল ঘোষ

অনলাইন ৩ আগস্ট ২০২০, সোমবার, ৬:২০ | সর্বশেষ আপডেট: ৭:৩৩

কাজী আসমা আজমেরির জীবন বদলে দিয়েছিল দুটি ঘটনা। দুটি ঘটনাই ছিল বাংলাদেশি হওয়ায় বিদেশের মাটিতে লাঞ্চনার শিকার। একবার ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটিতে আর অন্যটি সাইপ্রাসে। ভিয়েতনামে তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা। আটকে রেখেছিল ২৩ ঘন্টা। অন্যদিকে সাইপ্রাসে ২৭ ঘন্টা কারাগারে বন্দি ছিলেন। কিন্তু কোনকিছুই তার অদম্য ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এরপর তিনি পণ করেছিলেন আর যাই হোক নিজ দেশের সবুজ পাসপোর্ট নিয়েই লড়াইটি চালিয়ে যাবেন।
একটি দুটি নয় ১১৫টি দেশ ইতিমধ্যে ভ্রমণ শেষ করছেন। এর পাশাপাশি কাজ করছেন দেশের পাসপোর্টের মান উন্নয়নেও। বিদেশের মাটিতে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়তে চালাচ্ছেন প্রচারণা। আজমেরির ভ্রমণের আদ্যপান্ত আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুনুন তার নিজ জবানিতেই।

প্রশ্ন: নেপাল বেড়াতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দুনিয়া দেখবেন, সেখানকার কোন ঘটনা আপনাকে এমন স্পার্ক করেছিল?
২০০৯ সালের ঘটনা। আমি প্রথম নেপাল বেড়াতে যাই। আমার মানসিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। অনেকটা ডাক্তারি পরামর্শেই গাওয়া বদলের জন্য নেপালে যাওয়া। ওখানে যাওয়ার পর কাঠমুন্ডু থেকে এভারেস্ট দেখার এক ঘণ্টার একটি হেলিকপ্টার ট্যুর করি। হিমালয়ের বিশালতা ও সৌন্দর্য দেখে, মনে মনে বলি সত্যি কুয়োর ব্যাঙ এর মতো ছোট্ট একটি জায়গায় বসে রয়েছি বাংলাদেশে। আপনজনেরা মেয়ে বলে অবজ্ঞা করে। অনেক বিশাল সৌন্দর্য আর জ্ঞানের ভান্ডার নিয়ে পৃথিবী বসে রয়েছে। সে সময়ই তাকে দেখার ইচ্ছা প্রবলভাবে জাগে। হিমালায় দেখতে দেখতেই সিদ্ধান্ত নেই বাংলাদেশ থেকে বেরিয়ে পড়ার। বিশ্বটাকে ঘুরে দেখতে হবে। এভাবে ছোট জায়গায় নিজেকে বেঁধে রাখা আর স্বাধীনতা নষ্ট করা।

প্রশ্ন: ভ্রমণে একেকজনের পছন্দের বিষয় একেক রকম, আপনার কোন নির্দিষ্ট বিষয় আছে কি?
ভ্রমণে আমার প্রিয় বিষয় সেই দেশের মানুষ, তার কৃষ্টি-কালচার এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আর তার সঙ্গে নীল সমুদ্র আর উষ্ণ আবহাওয়া যদি থাকে তাহলে তো আরো যেন হৃদয় জুড়িয়ে যায়। যেমন প্রথমবার যখন ২০১০ সালে ক্রিসমাসের আগে প্যারিসে যাই শীতকালে, সাদা বরফে সমস্ত শরীর জমে শীতল হয়ে যায়। মনে হয় সেই হাড় কাঁপুনি শীতে তার সৌন্দর্যটা যেন অধরা রয়ে গেছে। এরপর আবার গত বছর গ্রীষ্মকালে গিয়েছিলাম প্যারিস। এবারেও তার সৌন্দর্য যেন সেই বর্ণনাতীত কবিদের তীর্থস্থান মনে হয়েছে।

প্রশ্ন: সবুজ পাসপোর্টে ভ্রমণ করতে গিয়ে কোথাও কোন অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়েছিলেন কিনা?
আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেন এত বছর নিউজিল্যান্ডে বসবাস করার পরও কেন বিদেশি পাসপোর্ট নেইনি। নিজের দেশকে ভালাবাসার প্রশ্নটিই মাথায় ঘুরে। যদিও কথা থাকে, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে খুব কম বাংলাদেশি আছেন যাদেরকে ভোগান্তি পোহাতে হয় না। বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে প্রথমবার যখন ২০১০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটি বেড়াতে গিয়েছিলাম, সাড়ে ৬ ঘন্টা ইমিগ্রেশন অফিসারদের জেরার মুখে পড়েছি। রিটার্ন টিকেট, হোটেল বুকিং না থাকায় অবৈধ অধিবাসী মনে করে ভিয়েতনাম ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাকে ২৩ ঘণ্টা কারাগারে রেখেছে। মনে অনেক ক্ষোভ জন্মেছিল। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম সেই রাতে। মাথায় খালি একটি প্রশ্নই জেগেছিল, কেন এমন হচ্ছে?

তারপর একই বছর মে মাসে গিয়েছিলাম সাইপ্রাসে। যেখানে বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভিসা ফ্রি ছিল। কিন্তু ভিসা ফ্রি থাকলেই তো বাংলাদেশিদের ঢুকতে দিবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। আগেরবারের অভিজ্ঞতায় এবার হোটেল বুকিং, রিটার্ন টিকেট, এবং ব্যাংকের স্টেটমেন্ট নিতে ভুল করিনি। কিন্তু সবকিছু থাকার পরও আমার শুধু সবুজ বাংলাদেশি পাসপোর্ট হওয়ায় সন্দেহবশতঃ সাইপ্রাসে ঢুকতে দিলো না। আজও সেই ২৭ ঘন্টা আমার জীবনকে বদলে দেয়ার জন্য অনেক কিছু। ভুলবো না সেইদিনের কথা, যখন ইমিগ্রেশন অফিসার আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে জেলখানায় ঢুকিয়ে রাখে। লজ্জায় অপমানে আমি প্রতিজ্ঞা করি বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েই বিশ্ব ভ্রমণ করব। আমি দেখিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশিরা কর্মক্ষেত্রে যেমন বিদেশে যায়, তেমনি ভ্রমণও করে।

প্রশ্ন: ‘হু’ বলেছে করোনাকে সঙ্গী করেই আমাদের বাঁচতে হবে, সেক্ষেত্রে ট্রাভেল প্রেমিরা কি ধরণের সঙ্কটে পড়বে?
করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে এটা অনেকটাই মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, একসময় চিকেন পক্স, কলেরাও মহামারি আকারে পৃথিবীতে এসেছিল। কিন্তু মানুষ বেঁচে ছিল, কেউ কেউ দেশ পরিবর্তন করে ভ্রমণ করেছে। বিশ্বে ভ্রমণকারীদের যেসব দেশে এসব মহামারি বড় আকারে ধারন করেছে ওইসব দেশগুলোকে বাদ দিয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা করতে হবে। আগের মতো আমরা মুক্ত বিহঙ্গের মত এখন ঘুরতে পারব না বাস্তব কারনেই। এটা মেনে নিয়ে আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় কিছুটা শিথিলতা আনতে হবে। তবে করেনা পরবর্তী পরিস্থিতি এক বছরের মধ্যেই পরিবর্তন হবে বলে আমি আশাবাদী।


প্রশ্ন: ভ্রমণ নিয়ে আপনার সমানের দিনে ভঅবনা কি? কতদূর এগুতে চান?
বিশ্বের ২৪৭ দেশের সমস্ত জায়গায় বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করতে চাই। আমি মনে করি, ভবিষ্যৎ শুরু হয় ‘আজ’কে দিয়ে, এখান থেকেই। আমি গত দুই বছর যাবত কাজ করছি ‘অবৈধভাবে বিদেশ ভ্রমণকে নিরুৎসাহিত করা’ এবং ‘বাংলাদেশি সবুজ পাসপোর্টে স্বল্প টাকায় ভ্রমণে উৎসাহিত করা’। আজকে যখন আমি কিংবা আমার দেশের একজন মানুষ সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করছেন তখন তিনি বা আমি বাংলাদেশের পাসপোর্ট এর মান উন্নয়নেই সহায়তা করছেন। কারণ আমাদের পাসপোর্টের মান কিছু কিছু ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী অবৈধ পথে, অবৈধভাবে ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশে গিয়ে আমাদের বদনাম ছড়িয়েছে। এটাকে উন্নয়নের জন্য সকল বাংলাদেশি ভ্রমণকারীকে চেষ্টা করতে হবে। তবেই আমাদের পাসপোর্ট এর মান উন্নয়ন সম্ভব।

প্রশ্ন: একজন নারী ট্রাভেলার হিসাবে কোন ধরণের বিড়ম্বনায় পড়েছেন কিনা?
একজন নারী ট্রাভেলার হিসেবে কখনোই কোন বিড়ম্বনায় পড়িনি। খুবই ছোট কিছু ঘটনা আছে, যেমন মুম্বই আমি সস্তায় কোন হোটেলে উঠতে পারছিলাম না, বাংলাদেশি নারী হওয়ায়। মরক্কো, দুবাই সন্ধ্যা/রাতের বেলা একা হাঁটলে ছেলেরা কিছুটা পিছু নেয়, হ্যাংলার মতো গায়ে পড়ে কথা বলতে চায়। এগুলো সাধারণত একটি মুসলিম কান্ট্রিগুলোতে দেখা যায়। তবে ইজিপ্টে মেয়েদের জন্য আলাদা মেট্রো কম্পার্টমেন্ট ছিল দেখেছি দশ বছর আগেই।

প্রশ্ন: নারীদের একা ভ্রমণে কি ধরণের সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার?
বাংলাদেশের অনেক নারীরা চাকরি-বাকরি করলেও অনেক ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারেন না। সেজন্য আমি যারা একা বেড়াতে যেতে চান বা সলো নারী ট্রাভেলারদেও কথা বলবো ‘সলো’ ভ্রমণ একটি মাধ্যম। যেখান থেকে আপনি আপনার নিজের সিদ্ধান্ত কিংবা মতামত নিতে পারবেন আপনার চলার পথে। একা চলার কনফিডেন্স পাবেন, শারীরিক কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে নিজের লাগেজ বহন করার মাধ্যমে। সময় জ্ঞান সম্পর্কে ধারনাও গুরুত্বপূর্ন বিষয় একা ভ্রমণে। তারও চর্চা হবে সলো ট্রাভেল করলে। সবচেয়ে বড় বিষয় দেশের বাইরে ভ্রমণ করে আপনি স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবেন। সেজন্য বাংলাদেশের প্রতিটি নারীর জীবনে একবার অন্ততঃ একবার একা ভ্রমণ করা উচিত।
প্রশ্ন: সাধারণ মানুষের ট্রাভেলের প্রয়োজনীয়তা কেন বলে আপনি মনে করেন? একজন সাধারণ বাংলাদেশি কি সহজে কিভাবে ভিসা পেতে পারেন?

ট্রাভেলের মাধ্যমে মানুষ খুব সহজেই অনেক কিছু শিখতে পারে। ভ্রমণ মানুষকে উদার করে , সহজেই ইংরেজি ভাষা শিখতে সাহায্য করে, সময় জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং বহির্বিশ্বে কি ঘটছে তার সম্পর্কে স্বচক্ষে অবগত হতে পারে। একজন ভ্রমণকারী কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করে প্রমাণ করেন যে তিনি একজন ট্রাভেলার। তখন তার জন্য খুব সহজেই অন্যান্য দেশগুলোতে ভিসা পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়।
প্রশ্ন: ভ্রমণের পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রমেও আপনি জড়িত আছেন।

ভ্রমণের সাথে সাথে ছোটবেলা থেকেই সুযোগ পেলেই মানুষের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। টিনেজার অবস্থাতেই রোটারি ইন্টারন্যাশনাল, রেডক্রস, ও সন্ধানী ডোনার ক্লাবের সদস্য। আমার বেড়ে ওঠা এমন একটি পরিবাওে যেখানে আমার নানা দুপুরে খাওয়ার আগে ২০-৩০ জন দরিদ্র মানুষকে না খাইয়ে খেতেন না। সেজন্য ছোটবেলা থেকেই দরিদ্র মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে হবে শিখেছি। আমার ৯০ তম দেশ ফিলিপাইন থেকে শুরু করেছি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছেলে মেয়েদের আমার ভ্রমণের গল্প শোনানো। যেন তরুণরা ভ্রমণের জন্য তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক দৃঢ় করতে পারে।

"Travelling is the fun way to learn" এই স্লোগান নিয়ে আজকে পর্যন্ত দেশ-বিদেশে প্রায় ২৯ হাজার ছেলেমেয়েকে ইন্সপায়ার্ড করছি ‘এক্সপ্লোর দ্যা ওয়ার্ল্ড’ এই স্বপ্নে। ইচ্ছে আছে মুজিব জন্ম শতবর্ষে ১ লক্ষ ছেলে মেয়ের সাথে আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করব। এছাড়াও বিদেশে যখন গিয়েছি সবচেয়ে বেশি খারাপ লেগেছে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বিষয়টি। যা সত্যিই ঘৃণ্যতম মধ্যযুগীয় ব্যাপার। এখনো পর্যন্ত আমাদের বাসার কাজের বুয়া, দারোয়ান, ড্রাইভার কিংবা রিক্সাওয়ালার সাথে আমরা অমানবিক ব্যবহার করে থাকি। এইসব মেহনতী মানুষের অীধকার রক্ষায় সোশ্যাল অ্যাওয়ারনেস তৈরির চেষ্টা করছি। ‘আপনি যা খাচ্ছেন আপনার বাসার কাজের লোককে খেতে দিচ্ছেন তো?’ এই স্লোগান নিয়ে আমি আমার ১০১তম দেশ থেকে ১১৫ তম দেশ পর্যন্ত ভ্রমণ করেছি। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই মানবিক শিক্ষা, যাতে করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ছেলে মেয়েরা বেড়ে উঠতে পারে উন্নয়নশীল চিন্তাভাবনা নিয়ে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Matin

২০২০-০৮-০৩ ২০:১৯:০৫

Very good job. I am sure it will inspire our youth. Youth are the strength for any developing country. president Obama was a inspired person for US Youth. All the best.

Badsha Wazed Ali

২০২০-০৮-০৩ ২০:১৬:৩০

Thank you for describing your experience of travelling in various countries. It could be more interesting if you shared the thinking, out looks, professions of different people of such countries. Yes, travelling enriches our knowledge. But it needs much money to for setting out of travelling. You are lucky enough you family is economically solvent.

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর

হাতিয়ায় নৌকা ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

নোয়াখালীর হাতিয়ায় মেঘনা নদীতে মাছ ধরার নৌকা ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃতরা হলেন- চরঈশ্বর ...



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত



৬ নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা

মামুনকে অব্যাহতি, তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি