ব্রেক্সিট নয়, এক্সিটের ভোটম্যাপে বৃটেন

প্রবাসীদের কথা

মুনজের আহমদ চৌধুরী | ৬ মে ২০১৭, শনিবার
আকর্ষণহীন আর প্রেডিক্টেবল এক নির্বাচনী ইতিহাসের পথে হাঁটছে বৃটেন। আগামী ৮ই জুনের সংসদ নির্বাচনের ফলাফল কি ঘটবে এটি নিঃসন্দেহে ধারণা করা যায়। নিদেনপক্ষে, বৃটেনের রাজনীতি নিয়ে যারা ন্যূনতম যারা ধারণা রাখেন তারা জানেন, ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টিই জিতবে। যে নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকা দলটির সন্দেহাতীতভাবে জয়ী হবার সমূহ সম্ভাবনা, এমন নির্বাচন কেন সরকারই হঠাৎ করে আয়োজনের তাগিদ অনুভব করলো? এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বৃটেন রাষ্ট্র বা জনগনের প্রাপ্তি-প্রত্যাশা কোথায়; এ লেখার গন্তব্য আসলে সে প্রশ্নের উত্তরের সন্ধান।
১. ব্রেক্সিট ট্রিগারের পর্যায়ে বৃটেনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে, সেটি প্রায় বছরখানেক আগে থেকেই লিখছি। কারণ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তেরেসা মের এ সরকারের এক অর্থে জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট নেই। বহুবার অন্তর্বর্তী নির্বাচনের দাবি উঠলেও প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে ছিলেন নিশ্চুপ। তাহলে হঠাৎ তিনি কেন গত ১৮ই এপ্রিল আচমকাই নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন? তাও খুব কম সময় মাঝখানে রেখে। বৃটেনের বিরোধীদল লেবার পার্টি স্মরণকালের মধ্যে নেতৃত্বের জটিলতায় এখন সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে। দলের অভ্যন্তরে প্রশ্নবিদ্ধ পার্টি লিডার জেরেমি করবিনের নেতৃত্ব। সোশ্যাল বেনিফিট বা শুধু নাগরিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আগের মতো ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। পক্ষান্তরে, ব্যক্তিগত সুবিধার আগে বৃটেনের অর্থনীতি; কনজারভেটিভের এমন নীতির পাশাপাশি লিবডেম ও ইউকিপে আস্থা হারানো বিরক্ত ভোটার শেষ পর্যন্ত মন্দের ভালো খুঁজছেন টোরির দলেই। গত দশকে আস্তে আস্তে বাম ধারার দল লেবার পার্টি ক্রমশ নেতৃত্বের পথ বেয়ে ডান ধারায় ঝুঁকছিল। আর, দুনিয়াজুড়েই এক ধরনের জোয়ার ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদের। সেটি কেবল যে আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বা ইউরোপের কিছু দেশে তা কিন্তু নয়। ভারতের সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনেও দেখেছি অভিন্ন চিত্র। ছিল বলছি এ কারণে, সম্প্রতি ফ্রান্স ও এর আগে বছরের শুরুতে নেদাল্যান্ডসের নির্বাচনেও অতি ডানদের পিছু হটা শুরু হয়েছে। এখন, বৃটেনে ফের ফার লেফটের পথে জেরেমির নেতৃত্বে লেবার পার্টির মূল নীতিতে ফিরবার পুনঃযাত্রায় বৃটিশ, বিশেষ করে ইংলিশ জনগণ কতটা প্রস্তুত, সেটিও প্রশ্নবোধক। লেবারের নেতৃত্ব নিয়ে ঘনীভূত সংকটের শতভাগ সুযোগ নিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা। বিরোধী শিবিরের প্রতিকূল বাস্তবতাকে শতভাগ নিজের অনুকূলে কাজে লাগাতে চেয়েছেন তিনি। যেখানে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে লেবার পার্টি ভোটের লড়াইয়ের জন্য দল হিসেবে অনেকটাই অপ্রস্তুত। সরকারের উপকূলে থাকা মাঠে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে লেবার পার্টি টানা তৃতীয়বারের মতো জনগণের ভোটে প্রত্যাখ্যাত হবে। এ পরাজয় আর দলীয় সংকটের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা হবে দলটির জন্য যথেষ্ট  সময়সাপেক্ষ। বর্তমান পার্টি লিডার জেরেমি করবিন একই সঙ্গে ব্যর্থ নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন। এর অব্যাবহিত পরবর্তী সময়ে লেবার পার্টি দলটির নতুন নেতৃত্বের জন্য ব্যস্ত থাকবে। আর ওই সময়ে তেরেসা মের সরকার থাকবে বিরোধীদলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের সুযোগে নিরাপদ। এরই মাঝে অবশ্য দু’শিবিরের অনেক সিনিয়র পার্লামেন্টারিয়ান আসছে নির্বাচনে না লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সার্বিক বিচারে এখন পর্যন্ত এ নির্বাচন কার্যত দেশটির সবচেয়ে আকর্ষণহীন সংসদ নির্বাচনে রূপ নিয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনে লেবার পার্টি কেন পরাজিত হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে এটুকু বলতে পারি, ব্রেক্সিটই একমাত্র কারণ নয়। লেবারের যে এমপি প্রার্থীরা এবারের নির্বাচনে লড়ছেন, তাদের বেশিরভাগ ব্রেক্সিটের গণভোটে রিমেইনের পক্ষে ক্যাম্পেইন করে হেরেছেন। গত বছরের ২৩শে জুন থেকে এ বছরের ৮ই জুন। মাঝখানের সময়স্বল্পতার নিরিখেই ভোটারদের ভুলবার নয়। দলীয় অভ্যন্তরীণ সংকটে দলটির বহু নেতাকর্মী নিজেরাই দল নির্বাচনে ক্ষমতায় যাবেÑ এটি বিশ্বাস করেন না। যদিও, লেবার সমর্থকরা বলছেন, এ নির্বাচন তেরেসা মে আয়োজন করছেন তার নিজের নেতৃত্বে আরো শক্তিশালী সরকার ও পছন্দসই ব্রেক্সিটের জন্য, আসলে বৃটেনের জনগণের জন্য নয়। দৃশ্যত, তেরেসা মে বিরোধী শিবিরের প্রতিকূলতাকে কাজে লাগাতে এ সময়টিকে মোক্ষম মনে করেছেন। আর নির্বাচন ঘোষণার পর পুুঁজিবাজার ও পাউন্ডের দরপতনের যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, তাও সত্য হয়নি। একথাও সত্য, বৃটেনে জনগণ ভোট দেয় দলগুলোর মূলত ম্যানিফেস্টো দেখে। শুধু শুরু থেকে ফেভারিট হিসেবে নয়, লন্ডনের গত মেয়র নির্বাচনে লেবারের সাদিক খানের জয়ের নেপথ্যে তার হোপার টিকিট, হাউজিংগের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দেয়া ইশতেহারটিও প্রভাবক ভূমিকা রাখে। যদিও, শুরু থেকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী জ্যাক গোল্ডস্মিথ সাদিকের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। লন্ডনের বারাগুলো বেশিরভাগই লেবার অধ্যুষিত। সাদিক খান ওই নির্বাচনে ৫৬.৮ শতাংশ ভোট পান। গোল্ডস্মিথ পান ৪৩.২ শতাংশ। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে কোনো দলের এককভাবে সরকার গঠন করতে হলে ৬৫০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে জিততে হবে ৩২৬টি আসনে। গত নির্বাচনে কনজারভেটিভ ৩৩০ আর লেবার পার্টি ২২৯টি আসনে জেতে। বাংলাদেশে বর্তমানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচিত সরকার দেশ শাসন করছে। বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতার উপর সরকার যেভাবে দেশ চালাচ্ছে, এখানকার সরকারি দলেরও এগিয়ে থাকার নেপথ্যে রয়েছে লেবারের সিদ্বান্তগত, কৌশলগত রাজনৈতিক ব্যর্থতা।
বৃটেনের জনগণ সব সময় শক্তিশালী সরকার চায়। এবার এক্ষেত্রে লেবার সরকার গঠন যদি শেষ অবধি গঠন করেও (যদিও সবগুলো জনমত জরিপ বলছে সে সম্ভাবনা নেই ) সেটি হবে দুর্বল কোয়ালিশন সরকার। একথা সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীও বল্টনে নির্বাচনী প্রচারণায় নিজে বলেছেন।
নির্বাচনে আমার ধারণা, বড় জয় পাবে কনজারভেটিভ। আসনসংখ্যা বাড়বে ব্যবধানে। বর্ণবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত ইউকিপের ভোট কমতে পারে বড় ব্যবধানে। গত নির্বাচনে যেসব ভোট পড়েছিল ইউকিপের বাক্সে, এবার সেসব ভোটের একটি বড় অংশের গন্তব্য হতে পারে কনজারভেটিভ। লিবডেম কিছুটা পরিসংখ্যানের গ্রাফে এগুলেও সেটি ক্ষমতার নিয়ামক হবে না। বর্তমান পার্লামেন্টে ৫৪টি আসন নিয়ে স্বতন্ত্র স্বদেশের দাবিদার স্কটিশ ন্যাশন্যাল পার্টি আগামীতেও ফ্যাক্টর হিসেবে থাকবে বৃটেনের রাজনীতিতে।
বিশ্বজুড়ে উগ্র আর একাধিপত্ববাদী জাতীয়তাবাদের জোয়ারের বিপরীতে বৃটেন কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম। এখানে আগামী নির্বাচনে রাইট ব্লক বিজয়ী হবে কিন্তু ফার রাইটিস্টরা নয়। অন্তত ইউকিপের মতো বর্ণবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত দলগুলো যে ক্ষমতার নিয়ামক হতে পারছে না, উল্টো হারিয়ে যাচ্ছে; সেটি বৃটিশ গণতন্ত্রের ভারসাম্যের বাহ্যিক সৌন্দর্য।
২. আগামী নির্বাচন বৃটেনের জন্য কেন দরকার, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজবার আগে একটি কথা বলে নিই। তেরেসা মে ইজ ভেরি স্পেসিফিক এন্ড ইউনিক এজ অ্যা লিডার। অনেকে তাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের অনমনীয় চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করতে ভালোবাসেন। আগামী নির্বাচনেও জয়ের পথ বেয়ে তেরেসা মের সরকার ব্রেক্সিট  সংহতভাবে বাস্তবায়ন করবে। জনগণের পুনরায় সরকারকে সার্বিক বিচারে আরো শক্তি জোগাবে। লেবারের ঐতিহাসিক পরাজয়ে কনজারভেটিভ পাবে আলটিমেট এন্ড এবসলিউট পাওয়ার।
৩. এ লেখার পাঠকদের কথা মাথায় রেখেই কিছু শব্দের বাংলা অনুবাদে সচেতনভাবেই যাইনি আমি। এ লেখা নিবেদিত বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষত বিলেত প্রবাসী আমাদের পাঠকদের জন্য। যা হোক, এবার মূল কথায় আসি। কেননা,  এ বিষয়টি এখনো বৃটেনের কোন ধারার মিডিয়াতে আলোচনায় আসেনি, যেটি আমি অনুভব করি। বৃটেনে এখন ব্রেক্সিটই একমাত্র সংকট নয়। ৮০০ বছর ধরে দেশটি লিখিত সংবিধান ছাড়া চলছে। কিন্তু, জেনোফোবিয়া বা প্রবাসীদের প্রতি বিদ্বেষ, বর্ডার, নাগরিক অধিকার বা প্রতিরক্ষায় জনগণের জবাবদিহিতার প্রশ্নে লিখিত সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়ছে। এমআই ফাইভ বা সিক্স, সিক্রেট সার্ভিসের মডিফাই বা রেগুলেশন এখন আর আলোচনার বাইরের বিষয় নয়। আর বিশেষত ব্রেক্সিট চূড়ান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, তৎপরবর্তী প্রতিবেশী আর সীমান্ত সমস্যার সমাধান, সার্বিক বাস্তবতায় সাংবিধানিক উদ্যোগ এসবের জন্য দরকার সর্বোতভাবে শক্তিশালী সরকার। সঙ্গত কারণে, আসন্ন আকস্মিকতাময় এ নির্বাচন শুধু ব্রেক্সিট কেন্দ্রিক নয়, এখানে অনেক সামাজিক, ভূরাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ইস্যু অনিষ্পন্ন। আসছে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনরায়ের পথ বেয়ে সরকার আসলে সাংবিধানিক সংস্কারের রুদ্ধ দুয়ারটিই উন্মুক্ত করতে চায়। আমি বিশ্বাস করি, ব্রেক্সিটের কিছুদিন পরই আমরা সিটিজেন এসেম্বলি কনসালটেশনের আলোচনা শুনতে পাবো। আমাদের তিন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপির অন্তত দু’জন ফের জিতে আসবেন বিলেতের পার্লামেন্টে। তৃতীয়জনের চান্স ফিফটি ফিফটি।
৪. গণতন্ত্র বা ভোটের রাজনীতি মানে ৫১ শতাংশের জয়ের বিপরীতে ৪৯ শতাংশ জনগণের নীতিবদ্ধ পরাজয়। কূটকৌশলের খেলা। দেশে দেশে রাজনীতির অন্দরমহলের যাপিত সৌন্দর্য। কিন্তু শেষ বিচারে বৃটেনে বহমান গণতন্ত্রেরই জয় হয়। ওয়েস্টমিনিস্টার পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির মতই বিশ্বের দেশে দেশে গণতন্ত্রের জয় হোক, এ আশাবাদ তব থাক অপরাজেয়।

লন্ডন মে ৬, ২০১৭ মুনজের আহমদ চৌধুরী; যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক, সদস্য-রাইটার্স গিল্ড অব গ্রেট বৃটেন।



 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

‘প্রধানমন্ত্রীর উপর হামলা চেষ্টার খবর ভিত্তিহীন’

‘প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চক্রান্তের খবর সম্পূর্ণ ভূয়া’

‘জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চক্রান্ত’

বান্দরবানের রোহিঙ্গারা কোন মনোযোগই পাচ্ছেন না

টেকনাফে চার লাখ ৯৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুই রোহিঙ্গা আটক

যুবলীগ নেতাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ

ধুমপানে বাধা দেয়ায় দোকানিকে সিগারেটের ছ্যাঁকা

পারমাণবিক যুদ্ধের হিম আতঙ্ক

লেবার নেতা হিসেবে সাদিক খানকে দেখতে চান বৃটিশ ভোটাররা

রোহিঙ্গাদের সমর্থনে বোস্টনে প্রতিবাদ বিক্ষোভ

কর্ণফুলীতে বিএনপির তিন প্রার্থীর নির্বাচন বর্জন

মনিপুর থেকে ১০৭ ‘বাংলাদেশী’ পুশব্যাক

পূর্ব লন্ডনে এসিড হামলায় আহত ৬

সাদুল্যাপুরে ১১২ মেট্রিক টন চাল জব্দ, গুদাম সিলগালা

রোহিঙ্গা ইস্যুতে এবার বিমসটেকেও ছায়া পড়েছে

রাজধানীতে আগুনে পুড়ে নিহত ১