অমর্ত্য সেন একটি বার্তা পাঠিয়েছেন

ফেসবুক ডায়েরি

সেলিম জাহান | ৪ জুলাই ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:০৬
বক্তব্যের বিশুদ্ধতা, তথ্যের নির্ভুলতা ও উপাত্তের সঠিকতার প্রতি তার আপসহীন নিষ্ঠা, অবিচল বিশ্বস্ততা এবং অখণ্ড সততা কিংবদন্তি পর্যায়ের। এ নিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা ও সততা, যা কিনা তার কাছে প্রায় উপাসনার সমতুল্য, তাই তাকে অনন্যসাধারণ করেছে। আমরা যারা তার কাছাকাছি আসার ও তার সঙ্গে একত্রে কাজ করার দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জন করেছি, তারা সবাই অধ্যাপক অমর্ত্য সেন সম্পর্কে এটা জানি। মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের কাজ উপলক্ষে প্রায়ই তার সঙ্গে দেখা করতে বস্টন যাই। আলোচনা করি, বিতর্কও হয়, তার মতামত ও উপদেশ আমার কাছে অমূল্য। প্রায়শ তিনিও ডেকে পাঠান- বিশেষত সপ্তাহ-অন্তে। হয়তো তার একা একা লাগে শনি-রবিবারে (বিশেষত এমা বস্টনে না থাকলে) কিংবা আমি নিঃসঙ্গ আছি ভেবে তিনি হয়তো পীড়িত হন।
আমাদের কথোপকথনের জায়গা তিনটি- হার্ভার্ড স্কোয়ারের তার প্রিয় ইতালীয় রেস্তরাঁর ফরাসী জানালার পাশের টেবিলটি, অথবা হার্ভার্ড ক্লাবের কৌণিক সোফাটি কিংবা লিটার হলে তার অফিস কক্ষে পুস্তকারণ্যের মাঝে কোনমতে দুটো চেয়ার পেতে। কাজের আলোচনা প্রায়ই নানান পথে বাঁক নেয়- তিনি তার বাবার কথা বলেন, ঢাকার কথা ওঠে, খুব মমতাভরে বেনুকে স্মরণ করেন।
কয়েক সপ্তাহ আগে যখন তার ওখানে গেছি, তখন সবে পড়ে শেষ করেছি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ‘আডভাবুকের কড়চা’। জানি অলোকরঞ্জন তার বিশিষ্ট বন্ধু, যৌবনে দু’জনে মিলে ‘স্ফুলিঙ্গ’ বলে একটা পত্রিকাও সম্পাদনা করতেন। আমি জানতাম সম্পাদক দু্থজন, কিন্তু অলোকরঞ্জন লিখেছেন, ‘অমর্ত্য, মধুসূদন ও আমি মিলে পত্রিকাটি সম্পাদনা করতাম’। কৌতূহল বশে আমি জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন,    ‘হ্যাঁ, মধুসূদন করও ছিল’। আমাদের আলোচনা আবার ভিন্নখাতে চলে গেল।
এর দু’তিন দিন পরে হঠাৎ আমার অফিস কক্ষে একজন যুবক এসে উপস্থিত। অধ্যাপক অমর্ত্য সেন একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। অতি যত্নে সে আমার হাতে তুলে দিল একটি চিরকুট- হলদে সাঁটা পত্র। তাতে হাতে লেখা ‘মধুসূদন কুণ্ডু, সহ-সম্পাদক’। বুঝলাম, সেদিন ‘মধুসূদন কর’ বলে যে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন, আজ তা শুধরে নিলেন। এর জন্যে কতটা তাকে খাটতে হয়েছে, তা আমার জানা নেই, কিন্তু বোঝা গেল যে একজন মানুষের সামান্য কৌতূহলও তার কাছে অতি মূল্যবান।
ঘটনার অবশ্য এখানেই শেষ নয়। সে দিন রাতে শুয়ে পড়েছি। রাত ১১টার দিকে বাড়ির ফোনের ঝংকার। অত রাতে ফোন এলে শঙ্কিত হই। ফোন তুলতেই পরিচিত গলা, ‘অমর্ত্য বলছি। শোনো, সহ-সম্পাদক যেটা লিখেছি, তা আসলে বোঝাচ্ছে ...’; ‘তা আসলে বোঝাচ্ছে,’ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলি, ‘আপনারা যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন, সহকারী সম্পাদক বোঝাচ্ছে না।’ ‘একদম তাই’, তিনি খুশি হয়ে যান। তারপরেই ফোন কেটে যায়।
ফোন ছেডে দিয়ে আমি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। আমি ভাবতে থাকি বিশুদ্ধতার প্রতি কতখানি নিষ্ঠা এবং কতখানি সৎ থাকলে পরে একটি মানুষ এমনটা করতে পারে। আমার মনে হতে থাকে সততা শুধু অর্থের নয়, চরিত্রের নয়, আমাদের বক্তব্যেরও, আমাদের কথারও। যে মানুষ এগুলো ধারণ করেন, তার সামনে নমিত হওয়া ছাড়া আর কিই বা করার থাকে? বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত তিনটের সনেটের’ প্রথম লাইনটিকে ঘুরিয়ে বলতে ইচ্ছে করে ‘যা সৎ, তাই পবিত্র’।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন