ইনবক্সে ফাঁদ

ফেসবুক ডায়েরি

ছানোয়ার হোসেন | ৮ জুলাই ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৯:৫৮
এক ভদ্র মহিলার কাছে একটা ম্যাসেজ আসল
“আপনি হয়তো বিষণ্ন মনে ভাবছেন সবার কাছে আপনি মূল্যহীন, আপনার জীবনের গতি থেমে গেছে, আপনার কোনো ভালো বন্ধু নেই, যাকে সব কথা বলা যায়, যখন খুশি তখন পাওয়া যায়, যেভাবে খুশি সেভাবে চাওয়া যায়......। আমি আপনার তেমন একজন বন্ধু.... আমি শুনব, আমি হাসাব, আমি সহজ করে দিব, আমি নাগালেই থাকব.....”
সোজা কথা এটা ছিল একটি গোপন প্রেমের প্রস্তাব, বা সম্পর্ক গড়ার একটি সাইকোলজিক্যাল ফাঁদ।
ম্যাসেঞ্জারের ফিল্টারে জমে থাকা এই ম্যাসেজ দেখে ভদ্র মহিলা ঘাবড়ে গেলেন- যদি স্বামী এটা দেখে ফেলে। তাই তিনি ভয়ে আতঙ্কে সেটা মুছে ফেললেন।
কিন্তু মন থেকে কি তিনি সেটা মুছে ফেলতে পারলেন? হয়তো পেরেছেন, কিংবা পারেননি। এটা মুছে দেয়া, না দেয়ার পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি কিন্তু আছে।
যেমন ধরুন, অধিকাংশ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী পুরুষটি অর্থের পিছেই দৌড়াচ্ছে। তার কর্মব্যস্ততার বিপরীতে ঘরের স্ত্রীর অবসর কিভাবে কাটে সেটা ব্যস্ত লোকটা জানে না। ক্রমাগত নিঃসঙ্গতায় ডুবে ডুবে স্ত্রী খুঁজে বেড়াচ্ছে বিস্তর পৃথিবীর অস্তিত্ব।
ফেসবুকে ফুটে ওঠা অসংখ্য মানুষের স্বপ্নময় জীবনের আনন্দ দেখে তার মনে মোহের জন্ম নিচ্ছে। চাহিদা অনুসারে সে চারদিক থেকে অর্জন করছে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান। অগণিত সুপুরুষের ব্যক্তিত্বের প্রতি সে হয়ে উঠছে আকৃষ্ট। সে প্রতিদিন হাতের কাছে বেড়ানো কিংবা ঘুরার মতো সুন্দর সুন্দর জায়গাগুলোতে সপরিবারে ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন গড়ছে। এভাবেই ধীরে ধীরে স্ত্রীর মনের মনিকোঠায় জমে উঠছে অসংখ্য স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, চাকচিক্যের প্রতি আকর্ষণ। এসব কিছুই তাকে খুব চঞ্চল করে তুলছে। ফেসবুক প্রোফাইলে তার ‘জুলেখা’ নামটা বদলে সে রাখছে ‘জুলী’। কিন্তু রাতের বেলায় স্বামীর কাছে সে সেই জুলেখাই রয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, ভেতরের নারীটি যে আর সেই ‘জুলেখা’ নেই সেটার খবর স্বামী রাখেনি। জুলেখা মুক্ত পৃথিবীর সাথে যুক্ত হয়ে স্বামীর বিকল্প হিসেবে একটি জগত তৈরি করে ফেলেছে। সে এখন সেখানেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। একাকী হলেই সে ঢুকে পড়ছে সেই স্বপ্নময় জগতে।
কিন্তু স্মার্ট কিংবা বোকা কিংবা একনায়ক স্বামী ভিন্ন কোনো ‘জুলী’দের দেখে মুগ্ধ হয়। ঘরের ‘জুলী’র খবর রাখার মতো সময় কিংবা আগ্রহ কোনোটাই তার হয় না। কিন্তু জুলেখার কাছে এটা অধিকার, এটা স্বপ্ন, এটা দাবি। কেননা, স্ত্রী এখনও হয়তো অনেকের কাছে বাপ-দাদাদের স্ত্রীর মতোই মূক অথবা শুধুই রাঁধুনী।
একটু আধুনিক স্বামী জুলেখার সাথে একটা সেলফি তুলছে, তার জন্মদিনে একটা কেক কেটেছে কিংবা বিবাহবার্ষিকীতে একটা গিফট দিচ্ছে- শুধু এফবি’তে পোস্ট দেয়ার জন্য। স্বামী নিজের ইচ্ছায়, নিজের পরিকল্পনায়, নিজের টাকায় কিংবা নিজের সুবিধামতো এই আয়োজনগুলো করছে। কিন্তু জুলেখার হয়তো ইচ্ছা ছিল তার এবারের জন্মদিনের কেকটার রং হবে গোলাপি, কিন্তু হয়ে গেছে সাদা। তার হয়তো স্বপ্ন ছিল এবারের বিবাহবার্ষিকীতে তারা কক্সবাজার বেড়াতে যাবে, কিন্তু স্বামীর আয়োজনে বাঁধা পড়ে দিনটা কাটিয়ে দিয়েছে রান্নাঘরেই। এভাবেই জুলেখার স্বপ্ন মার খায়।
এগুলো হয়তো সব স্বামী কিংবা স্ত্রীর জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে, অনেকের জন্যই প্রযোজ্য। প্রযোজ্য বলেই তো দুষ্টলোকরা ম্যাসেঞ্জারের ফিল্টারে ‘নারী শিকারের টোপ’ হিসেবে এরকম গণপ্রেমের পত্র পাঠিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকে।
নারীর মনের কষ্ট আর চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ছেলেটা ওই ম্যাসেজের ভাষা সাজিয়ে গুছিয়ে লিখেছে। হতে পারে এটা কোনো সহজ সরল নারীকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইলিং করার একটি ফাঁদ। কিন্তু ক্ষেত্রটা তো ঘর থেকেই তৈরি হয়ে আছে। ফেসবুক কিংবা ভাইভারের দখল পেয়ে হঠাৎ স্বাধীন হওয়া অনেক নারীই তো সমাজের জটিলতা-কুটিলতা বুঝে উঠতে পারে না। তাই তাদের কাছে সেই ছেলেটির বানানো ম্যাসেজটি একটি ‘প্রোডাক্ট’-এর আদলে খুব কার্যকর মনে করে জুলেখা। স্বামী হয়তো জেনে গেলে বলবে- এ পথটা ভুল। কিন্তু সহজ সরল জুলেখাদের কাছে তো এটা হেসে-খেলে বেঁচে থাকার ‘পথ’।
ছেলেটার ম্যাসেজের ধরন দেখে বোঝা গেল অসংখ্য নারীকে সে এই ম্যাসেজটি পাঠিয়েছে। ২/১ জন নারী রাজি হলেই তার চলবে। ম্যাসেঞ্জারে ম্যাসেজ সার্ভিস ফ্রি বলেই হয়তো অনৈতিক প্রেমটাও তার কাছে ফ্রি হয়ে গেছে। কিন্তু মনের অজান্তে জুলেখার স্বামীও এই ফ্রি প্রেমের ক্ষেত্র তৈরিতে কম ভূমিকা রাখেনি।
যাহোক, জুলেখাদেরও বুঝতে হবে দূরের কোনো স্বপ্নময় অচেনা পুরুষের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুখ কাছের মানুষের দেয়া দুঃখের থেকে উত্তম নয়। ক্ষণস্থায়ী সুখের বাটিতে ঢেলে রাখা মধুতে যে বিষ মাখানো থাকে তা বোঝার জন্য দেহের চোখের জ্যোতির চেয়ে মনের চোখের জ্যোতি বেশি দরকার হয়।
সিটি করপোরেশনের হিসাবে তালাকের পরিসংখ্যান বেড়ে যাওয়ার পেছনে মনের চোখের অন্ধত্ব অনেকটাই দায়ী।
আবার, জুলেখাদের রেখে আরেক জুলীর কাছে স্বামীরা যাচ্ছে বলেই সমাজের কিছু জুলেখাদের জুলী হয়ে সুখ খুঁজতে হচ্ছে। কিংবা কিছু জুলেখা জুলী হয়ে ভিন্ন পথে সুখ খুঁজে বলেই স্বামী ভিন্ন কোনো জুলীর কাছে আশ্রয় নিচ্ছে। মাঝখানে সন্তান, পরিবার আর সমাজ হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে উদ্ভব হচ্ছে ইনবক্সের সেই সুবিধাবাদী গ্রুপের যারা হয়তো আর ফিল্টারে আটকে থাকছে না, সোজা ঢুকে পড়ছে বেডরুমে।
তাই ইনবক্সের যত্ন নিন, আউট বক্সের সময়টা একটু কমিয়ে দিয়ে।
(ডজনখানেক যুগলের দাম্পত্য জীবনের বাস্তব সংকটের বিশ্লেষণ থেকে এ লেখাটি লিখলাম। দয়া করে এটাকে সর্বজনীন ভেবে কেউ কষ্ট নেবেন না। এটা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। আর জুলেখা নামটাও কাল্পনিক)।


 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Al-Emran.

২০১৭-০৭-০৭ ২০:২৯:০৭

Right

আপনার মতামত দিন

রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে চীনের তিন দফা প্রস্তাব

সিএনজি অটোরিকশার ৪৮ঘন্টার ধর্মঘট

শাহজালালে ৩ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণসহ আটক ১

দীপিকার মাথা কাটলে পুরস্কার ১০ কোটি রুপি!

নিউ ক্যালেডোনিয়ায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প

কেন সৌদি আরব ও ইরান পরস্পরের প্রতিপক্ষ?

বন্দুকের নলের মুখেও ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নন মুগাবে

বাংলাদেশের বন্ধু, মার্কিন কূটনীতিক হাওয়ার্ড বি শেফার আর নেই

তারেক রহমানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

গেদে সীমান্তে পিতা-পুত্রের মিলন, আবেগঘন এক দৃশ্য

বিএনপির নেতার বাসার সামনে থেকে বোমা উদ্ধার

‘পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি যৌন নিপীড়ক’

দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার পঙ্কজ রায়

কেক কেটে তারেক রহমানের জন্মদিন পালন

মা ও ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করলো যুবক

কানাডার উন্নয়নমন্ত্রী আসছেন মঙ্গলবার