নি র্বা চ নী হা ল চা ল

সমীকরণ জটিল, লড়াই হবে কামরুল-আমানে

প্রথম পাতা

কাফি কামাল | ১৭ জুলাই ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৩৮
সীমানা পুনঃনির্ধারণ জটিলতায় দেশের যেসব আসনে নতুন মেরূকরণ ঘটেছিল তার একটি কেরানীগঞ্জ। নবম জাতীয় নির্বাচনের আগে (ঢাকা-৩) নির্বাচনী আসনটি বিভক্ত করা হয়েছিল (ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩) আসনে। কেরানীগঞ্জের একাংশের সঙ্গে ডিসিসির ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড, কামরাঙ্গীর চর, হাজারীবাগের সুলতানগঞ্জ ইউনিয়ন ও সাভারের আমিনবাজার, তেঁতুলঝোড়া ও ভাকুর্তা ইউনিয়ন মিলিয়ে গঠন করা হয় ঢাকা-২ আসন। কামরাঙ্গীর চরের ১ লাখ ২৩ হাজার, কেরানীগঞ্জের ১ লাখ ৬৬ হাজার ও সাভারের ৮৮ হাজার ভোটার মিলিয়ে এ আসনের ভোটার সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৮ হাজার। ধানের শীষের দুর্গ হিসেবে এককালে খ্যাতি ছিল কেরানীগঞ্জের। কিন্তু সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর কেরানীগঞ্জ, সাভার ও ডিসিসির ত্রিমাত্রিক রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ও প্রভাবের কারণে জটিল হয়ে ওঠে এ আসনে ভোটারদের মেরুকরণ। ঢাকা-২ আসনের সীমানা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে স্থানীয় এমপি ও খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের। দশম নির্বাচনের আগে কেরানীগঞ্জের অংশটি বাদ দিয়ে সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত এলাকার সঙ্গে ঢাকা-৭ আসনের ২৩ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে সীমানা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব এনেছিলেন। এর পক্ষে অর্ধশতাধিক আবেদনও জমা পড়েছিল। সাবেক এমপি আমানউল্লাহ আমান পুরো কেরানীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে একটি আসন করার আবেদন করেছিলেন। তবে ঢাকার একাধিক এমপির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সেটা বাস্তবায়ন হয়নি।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে জটিলতা ছিল দুই শিবিরেই। আইনি জটিলতায় আমান উল্লাহ আমান নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ায় প্রার্থী সংকটে পড়েছিল বিএনপি। পরে তারা তুলনামূলক কম পরিচিত স্থানীয় নেতা অধ্যক্ষ মতিউর রহমানকে প্রার্থী করেছিল। অন্যদিকে এ আসনে আওয়ামী লীগেরও ছিল না শক্তিশালী প্রার্থী। ওয়ান ইলেভেনের দুঃসময়ে আদালত অঙ্গণে সক্রিয় ভূমিকার কারণে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের নেকনজরে ছিলেন এককালের মহানগর নেতা অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। দুঃসময়ের সঙ্গে থাকার পুরস্কার হিসেবে ঢাকা-২ আসনে নৌকা প্রতীক পান তিনি। আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের দুই সম্ভাব্য প্রার্থীর বিপরীতে একক সম্ভাব্য প্রার্থী বিএনপির। অন্যদিকে এ আসনে প্রার্থী হতে পারেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু। আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের সম্ভাব্যতা ধরে নিয়ে নির্বাচনী ছক কষছে আওয়ামী লীগ। খোদ প্রধানমন্ত্রীই বিভিন্ন জনসভায় ভোট চাইছেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য আসনের মতো ঢাকা-২ আসনেও ক্ষমতাসীন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচারণা শুরু করেছেন।
নবম জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-২ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। পরে তিনি আইন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তিনি এমপি নির্বাচিত হন এবং খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও এ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী কামরুল ইসলাম। ১০ম জাতীয় নির্বাচনে এ আসনে নৌকা প্রতীক চেয়েছিলেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও উপজেলার চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ। আগামী নির্বাচনে কেরানীগঞ্জ উপজেলার দুবারের চেয়ারম্যান তরুণ এ নেতাও আওয়ামী লীগের একজন সম্ভাব্য প্রার্থী। দু’বারের এমপি কামরুল ইসলামকে নিয়ে নানা অভিযোগ কেরানীগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের।
১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত চারটি নির্বাচনে অবিভক্ত কেরানীগঞ্জ আসনটি ছিল ধানের শীষের দখলে। প্রতি বারই বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকসুর সাবেক ভিপি ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা আমান উল্লাহ আমান। পঞ্চম নির্বাচনে মোস্তফা মহসিন মন্টু, ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়, সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোহাম্মদ শাহজাহান ও অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নসরুল হামিদ বিপুকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। পঞ্চম সংসদে স্বাস্থ্য ও অষ্টম সংসদে পালন করেছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। ওয়ান ইলেভেনের পর গ্রেপ্তার বিএনপির সিনিয়র নেতাদের একজন আমান কারাভোগ করেন ২২ মাস। আইনি জটিলতার কারণে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি ২০০৮ সালের নির্বাচনে। তবে রাজনীতিতে সক্রিয় আমান উল্লাহ আমান। আগামী একাদশ নির্বাচনে তিনিই এখন পর্যন্ত বিএনপির সম্ভাব্য একক প্রার্থী। তিনি ফের আইনি জটিলতায় পড়লে এ আসনে প্রার্থী হতে পারেন- নাজিমউদ্দিন মাস্টার, রেজাউল করিম পল, মনির হোসেন চেয়ারম্যান ও শিল্পপতি মাহীনের মধ্যে যে কেউ।
কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা শাহীন কাওসার বলেন, ঢাকা-২ আসনের মধ্যে পড়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড। নানা সমস্যায় জর্জরিত এসব এলাকার মানুষ। নিম্ন আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস এখানে। কিন্তু যে অনুযায়ী আবাসন সংকট নিরসনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কামরাঙ্গীরচরের মানুষের বিদ্যুৎ সংকট কাটেনি। সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত এসব এলাকায় এখনও স্ট্রিট লাইটের আলো জ্বলে না। ফলে রাত বাড়লেই উৎপাত বাড়ে ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের। রাস্তাঘাটের বেহালদশার পাশাপাশি প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জলাবদ্ধতা। কামরাঙ্গীর চরের বাসিন্দা মকবুল হোসেন বলেন, কামরাঙ্গীর চরে প্রবেশের প্রধান সড়কের মুখেই নির্মাণ করা হয়েছে টেম্পু স্ট্যান্ড। এতে গোটা এলাকায় তৈরি হয়েছে অসহনীয় যানজট। যে যানজটের দুইপ্রাপ্ত গিয়ে দাঁড়ায় সদরঘাট থেকে গাবতলী। সুলতানগঞ্জের ভোটার রইসউদ্দিন বলেন, পুরো কামরাঙ্গীরচর ও হাজারীবাগ এলাকাটি একটি ময়লার ডিপোতে পরিণত হয়েছে। মানুষের বাস উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে কোনো উদ্যোগ নেই। ৫৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা কিন্তু ওয়াসার লাইন আসেনি। গভীর নলকূপের ওপর নির্ভর কামরাঙ্গীর চরের বিপুল জনগোষ্ঠী। রসুলপুর ব্রিজ মার্কেটের ব্যবসায়ী সামসুল আলম বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী কামরুল ইসলাম ও শাহীন আহমেদের প্রচারণা থাকলেও বিএনপির তেমন প্রচারণা নেই। কলাতিয়ার মহসিনুল হক বলেন, ঢাকা সিটি করপোরেশনের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বে দিকে যেভাবে দিনদিন উন্নত হচ্ছে ঠিক উল্টোভাবে পিছিয়ে পড়ে আছে পশ্চিমদিকের এ কেরানীগঞ্জ। বিগত ১০ বছরে এলাকায় উন্নয়নের কোন ছোঁয়া লাগেনি। উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনা করেই আগামীতে কেরানীগঞ্জের মানুষ ভোট দেবে। বছিলা এলাকার বাসিন্দা রাজিবুল হায়দার বলেন, বছিলা এলাকার বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমি দখল। কাচা টাকার ঘ্রাণ এ সমস্যাকে জনপ্রতিনিধিদের কাছে আড়াল করে রেখেছে।  
খাদ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা-৩ আসনের মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন। নির্বাচনকে সামনে রেখে আমি মতবিনিময় সভা করছি, প্রস্তুতি নিচ্ছি। কামরাঙ্গীর চরে আমার অবস্থান সলিড, সাভারেও আমি ভালো অবস্থানে আছি। আমার পাবলিক পারসেপশন কি রকম সেটা আপনারা খবর নিয়ে দেখতে পারেন। মানুষ আমাকে খারাপ বলে না ভালো। উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, কামরাঙ্গীর চরে আমি যা করে দিয়েছি তাতে কামরাঙ্গীর চর এখন ঢাকার যে কোন অংশের চেয়ে কম নয়। আমার ব্যাপারে কামরাঙ্গীর চরের লোকজনের কোনো অভিযোগ নেই কারণ সেখানে আমি হাসপাতাল করেছি, স্কুল করেছি, সবকিছু করেছি। আর কিছু কিছু সমস্যা তো থাকতেই পারে, হতেই পারে। সবাইকে কি ষোলো আনা সন্তুষ্ট করা যায়। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও বহিরাগত প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, এটা কামরাঙ্গীর চর ও সাভারের লোক বলবে না, বলবে কেরানীগঞ্জের লোক। কেরানীগঞ্জের যে প্রার্থী হতে চায় সে আমার সম্পর্কে অনেক কথাই বলতে পারেন। তিনটি এলাকা মিলিয়ে আমার নির্বাচনী আসন। কেরানীগঞ্জের লোক বা সাভারের লোক হলে বলতেই পারে আমি বহিরাগত। আর আমাকে যিনি বহিরাগত বলছেন তিনিও তো নোয়াখালীর লোক। আওয়ামী লীগের অন্য যে সম্ভাব্য প্রার্থী তার ব্যাপারে আমার কিছুই বলার নেই। এলাকায় ঘুরে দেখতে পারেন তার জনপ্রিয়তা কতটুকু, কি রকম লোক, কি করেন না করেন।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রী আমান উল্লাহ আমান বলেন, কেরানীগঞ্জের সন্তান হিসেবে এখানকার মাটি ও মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক বিদ্যমান। চারবার বিএনপির টিকিট পেয়ে প্রতিবারই নির্বাচিত হয়েছি। আইনী প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে ২০০৮ সালে নির্বাচনে আমাকে অংশ নিতে দেয়া হয়নি। আগামী নির্বাচনে দল যদি আমার ওপর আস্থা রাখে কেরানীগঞ্জবাসী আগের মতোই তার প্রতিদান দেবে। আমান বলেন, বিএনপির সময়ে প্রচুর ব্রিজ ও বাইপাস রাস্তা নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগ সহজতর করেছি। কেরানীগঞ্জের বহু শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। বিগত ৮ বছরে উন্নয়নের সে ধারাবাহিকতাই রক্ষা হয়নি। আওয়ামী লীগের আমলে গ্যাস ও পানির সমস্যার অগ্রগতি না হওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছে কেরানীগঞ্জের শিল্পকারখানা। তিনি বলেন, কেরানীগঞ্জের একটি বড় সমস্যা আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক। ঢাকা-২ নির্বাচনী এলাকায় কোনো পুলিশ স্টেশন নেই। কেরানীগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ মডেল থানা দুইটিরই অবস্থানে ঢাকা-৩ আসনে। বর্তমান সরকারের আমলে কেরানীগঞ্জকে সন্ত্রাসকবলিত এলাকায় পরিণত করেছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। আমান বলেন, আগামী নির্বাচনে পরীক্ষিত বন্ধুকেই বেছে নেবে কেরানীগঞ্জের মানুষ।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, আমি ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে আসছি। তারই পরিক্রমায় এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছি। নবম জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নসরুল হামিদ বিপুর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ছিলাম। দশম জাতীয় নির্বাচনে আমি ঢাকা-২ থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলাম। কেরানীগঞ্জের সন্তান হিসেবে এবার আমি মনোনয়নের মূল দাবিদার। দল আমার উপর আস্থা রাখলে আমি তার সুফল দেয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। বিগত দুইটি উপজেলা নির্বাচনে আমি সেটা প্রমাণ করেছি। জনগণ সবসময় নেতাদের কাছে পেতে চায়। আমি সবসময় জনগণের সে চাওয়া পূরণের চেষ্টা করি। এককালে বিএনপি অধ্যুষিত কেরানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান গড়তে সাংগঠনিক ভূমিকার পুরস্কার আমি আশা করতে পারি। তিনি বলেন, বর্তমান এমপি একজন পূর্ণমন্ত্রী হলেও তার চেষ্টায় এলাকায় কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয়নি। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। কেরানীগঞ্জের মানুষের এককথা, তারা আগামীতে বহিরাগত ও কেরানীগঞ্জের সঙ্গে সম্পর্কহীন কাউকে ভোট দেবে না।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন