প্রসঙ্গঃ কৃষ্টি ও সংস্কৃতির আগ্রাসন রোধে প্রবাসীদের ভূমিকা

প্রবাসীদের কথা

কাজী সুলতানা শিমি | ১৭ জুলাই ২০১৭, সোমবার
বলছিলাম কৃষ্টি ও সংস্কৃতির আগ্রাসন এর কথা। ইদানীং বেশকিছু সংগঠন, ব্যক্তিবিশেষ ও ওয়েব পোর্টাল পশ্চিমবাংলার শিল্পী ও সংস্কৃতির প্রচারণায় নেমেছেন বেশ জোরেসোরেই। এদের উদ্দেশ্য কি ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। কৃষ্টি ও সংস্কৃতির দিক থেকে পশ্চিমবাংলা,  আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রথম ও প্রধান প্রতিদ্ধন্ধী। তারা সংস্কৃতি চর্চায় আমাদের দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে। পাশাপাশি তাদের প্রচারণার বিশালতাও অনেক।
সেকারণে আমাদের গণমাধ্যম গুলো তাদের প্রমোট না করলেও তাদের কিছু যায় আসেনা কিংবা তারা থেমে থাকবেনা। অনেকে বলতে পারেন ভালো জিনিষ উপভোগ করার সুযোগ করা উচিৎ। কিন্তু ব্যাপারটা অনেকটা তেলা মাথায় তেল দেয়ার মতো নয় কি!
আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতি যতই দুর্বল ও নড়বড়ে হোক না কেন, তা কালজয়ী করার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। ভাবুন তো একবার। আমার নিজের সন্তান যদি অসুস্থ বা প্রতিবন্ধীও হয় সেতো আমারই সন্তান। তাকে দুরে সরিয়ে দিয়ে কি আমরা প্রতিবেশীর ফুটফুটে সন্তানটিকে নিজের বলে দাবী করতে পারি! বড়জোড় একটু কোলে নিয়ে আদর দিতে পারি। তেমনি প্রতিবেশী দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি যতোই ভালোলাগুক বড়োজোড় তাদের নিজেদের আয়োজন করা অনুষ্ঠানে গিয়ে উপভোগ করতে পারি। সেটা শুধু নিজস্ব আনন্দ পাওয়ার জন্য। কিংবা তুলনা করার জন্য। অনুকরণ বা অনুসরণ না করে, কি করে সেটা দেখে আরও ভালো আরও সৃষ্টিশীল হওয়া সম্ভব তার প্রতি মনোযোগ হওয়ার জন্য। কিন্তু প্রচারণায় নামতে হবে কেনো!! ১৯৭১ থেকে আমরা স্বাধীন দেশ। আমাদের মানচিত্র ও ভূখণ্ড আলাদা। স্বাধীন দেশ হওয়া স্বত্বেও আমরা অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে এখনো অনেকটা পরাধীন। আর সেটা আমাদের মানসিকতার কারণে। শিখতে হবে সুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে, চাটুকারিতা করে নয়।
দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতিতে, নাট্যাঙ্গনে ইদানীং পশ্চিম বাংলার শিল্পীদের নিয়েই মাতামাতি। সেটা প্রলুব্ধ হচ্ছে এই পরবাসেও। সারাদিন ঘরে-বাইরে কর্ম ব্যস্ততার পর ভালোলাগে দেশকে নিয়ে ভাবতে। ইচ্ছে করে নিজের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে চর্চা করতে। কিন্তু বহুজাতিক কালচারে আমাদের ছেলেমেয়েরা যেখানে অন্যান্য শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহি হতে চায় সেখানে আবারো একই পশ্চিম বাংলার বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে প্রচারণার যুক্তি নিতান্তই অবান্তর। বরঞ্চ বাংলাদেশের বাংলা শিল্পী ও কৃষ্টিকে কিভাবে আরও সমৃদ্ধ করা যায় তা নিয়ে ভাবা উচিৎ। ব্যক্তিগত আনন্দ কিংবা ব্যক্তিগত তৃপ্তির জন্য না হয় কিছু কিছু অনুষ্ঠানে যাওয়া যায়। তাই বলে পশ্চিম বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতিকে নিজের বলে দাবী করে মোটেও নিজের জাতি স্বত্বাকে বড়ো করা যায়না। কেননা ৭১ আমাদের স্বাধীন করেছে নিজের সত্তাকে বিকাশ করার জন্য। বিশেষকরে গণমাধ্যমে প্রচার করে পরদেশের শিল্পকে অনুপ্রাণিত করা মোটেও দেশপ্রেমের আওতায় পড়েনা। এটা শঠতা।
এক্ষেত্রে বৈশাখী মেলা কিছুটা বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল আয়োজিত অলিম্পিক পার্কে নববর্ষের বৈশাখী মেলা বাংলাদেশীদের জন্য একটি বড়ো অর্জন। বলা যায় বাংলাদেশীদের আয়োজিত এ মেলা প্রবাসে দেশের বাইরে সব’চে বড়ো মিলন মেলা। এ মেলায় অংশগ্রহণ করার জন্য আজ পশ্চিমবাংলা’র বহুশিল্পী তীর্থের কাকের মতো তদ্বির করেন। তথাকথিত কিছু শিল্পবোদ্ধা তাদের সুযোগ দেয়ার জন্য নানা কৌশলও অবলম্বন করেন। অথচ তাদের চিন্তাতে আসেনা যে বাংলাদেশের বাংলাটাই আমাদের প্রজন্ম ঠিকমতো এখনো গ্রহণ করেনি। পাশাপাশি পশ্চিমবাংলা’র একই বাংলা শিল্পীকে সুযোগ দিতে যে সময় ক্ষেপণ হবে তাতে অন্যদেশের আরেকটি অনুষ্ঠান প্রচার করা যাবে। এতে নতুনত্ব আসবে। কেননা এটি মাল্টি-কালচারাল করার চিন্তা করা হয়েছে কেবল মাত্র নতুন প্রজন্মকে ধরে রাখার জন্য। আগ্রহী করার জন্য। একই সাথে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলা’র একইরকম ভাষা ও অনুষ্ঠান প্রচার করা হলে তাতে একঘেয়েমি সৃষ্টি হবে। সেজন্য আরেকটি দেশের বাংলাকে প্রচার ও প্রচারণা দেয়া উপযাচক হওয়া মাত্র। তার’চে বৈচিত্রতা আনা জরুরী। যাতে এ মেলার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে। কিছুদিন আগে মেলা পরবর্তী একটি পর্যালোচনা বৈঠকে মিডিয়ার সাথে এ বিষয়টি নিয়ে গুরত্তের সাথে আলোচনা করা হয়। কোনভাবেই পশ্চিমবাংলা’র কোন শিল্পীদের এ মেলায় সুযোগ দেয়া উচিৎ নয়। তাছাড়া এতে করে বাংলাদেশের শিল্পীরাও সুযোগ হারাচ্ছে। তার’চে অন্য সংস্কৃতির প্রজন্মকে আমাদের সংস্কৃতিতে পরিচিত করা  বেশি দরকার।   
এ প্রসঙ্গে টমাস আলভা এডিসনের জীবনকথন  একটা উদাহরণ হতে পারে। গ্রামোফোন, ভিডিও ক্যামেরা ও বৈদ্যুতিক বাল্ব সহ আরও বহু আধুনিক যন্ত্রের উদ্ভাবক টমাস আলভা এডিসন।শিশু  এডিসন একদিন স্কুল থেকে ফিরে একটি চিঠি দিলো তার মাকে। অভিভাবককে লিখা শিক্ষকের চিঠিটা পড়ে তার মা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। হতভম্ব এডিসন অবাক হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলো কি লিখা আছে ঐ চিঠিতে! তার মা চিঠিটি এডিসনকে না দেখিয়ে শুধু পড়ে শোনালেন। ছেলের উদ্দেশে তিনি পড়লেন, চিঠিতে লেখা আছে-আপনার ছেলে অনেক প্রতিভাবান। তাকে সঠিক শিক্ষা দেয়ার জন্য আমাদের স্কুল যথেষ্ট নয়। দয়া করে আপনি নিজেই তাকে শিক্ষা দিন। এডিসন ছিল বাবা-মায়ের সপ্তম ও সর্বশেষ সন্তান। তার মা তাকে আর স্কুলে না পাঠিয়ে নিজেই শিক্ষা দিলেন। একদিন শতাব্দীর সেরা উদ্ভাবক হিসেবে তিনি বিংশ শতাব্দীকে আলোড়িত করে দিলেন। ততদিনে তার মা আর বেঁচে নেই। মার মৃত্যুর পর একদিন পুরনো জিনিষ ঘাটতে গিয়ে তার মার রেখে দেয়া সেই পুরনো চিঠিটি চোখে পড়লো। যে চিঠিতে শিক্ষক তাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিল-আপনার ছেলে মানসিক ভাবে অসুস্থ। আমরা তাকে আমাদের স্কুলে রাখতে পারছিনা। তাকে বহিষ্কার করা হল...। একজন মা যেমন তার অসুস্থ কিংবা মানসিক ঘটতি সম্পন্ন সন্তানকে নিজের যত্ন ও অনুপ্রেরণায় বিশ্বসেরা মানুষ রূপে তৈরি করতে পারেন, তেমনি একজন দেশপ্রেমিক নিজের সংস্কৃতি তা যতই দুর্বল হোকনা কেন তার ইতিবাচক প্রচার, প্রকাশ ও প্রেরণা দিয়ে তাকে সৃষ্টিশীল করে তুলতে পারে। একটু ইতিবাচক প্রেরণায় হতে পারে অসাধারণ পরিবর্তন। 
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করার কথা বলে শেষ করবো। গতবছর সিডনীর  বহুল পরিচিত একটি ওয়েব পোর্টাল পশ্চিমবাংলা’র একটি ছবি প্রদর্শন করার আয়োজন করে।ছবি প্রদর্শন শেষে সংবাদটি বাংলাদেশের জাতীয় পত্রিকাতেও প্রকাশ ও প্রচার করা হয়। কিন্তু সেই সংবাদটি ছবির পরিচালক কিংবা কর্তিৃপক্ষ কোথাও শেয়ার কিংবা প্রচার করার মতো উদারতা দেখাতে পারেননি। এমনকি নিজস্ব ফেসবুক পেজেও নয়। কেননা সেখানে ওয়েব পোর্টালটির যাবতীয়  কার্যক্রম ও পরিচিতি’র কথাও ছিলো। ছবিটি প্রদর্শনীর ব্যাপারে যে পোর্টালটি শ্রম দিয়েছিলো তার বর্ণনা থাকায় সে সংবাদটি তাদের কাছে গুরত্বপুর্ন মনে হয়নি। যদিও সংবাদটির শিরোনাম ছিলো ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি। যে দেশের মানুষ এই বাংলার কুশলীদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে জানেনা কিংবা জানলেও ইচ্ছে করে সম্মান দেখায়না তাদের প্রতি কেন আমাদের এতো আদিখ্যেতা! চাটুকারিতা! তার’চে নিজের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন ও শ্রদ্ধা করতে শিখুন। প্রচার ও প্রসারে গুরত্ব দিন। সমালোচনা বা সমস্যা তৈরি করে নয় সমাধান করার উপায় নিয়ে চিন্তা করুন। দেখবেন সেদিন বেশী দুরে নয় যেদিন এ প্রজম্মের ছেলেমেয়েরাও তাদের বন্ধুদের বলতে শুনবে- আমরা জানি বাংলাদেশ কোথায় আর কি তার সংস্কৃতি। তারজন্য দায়িত্ব নিতে হবে আমাদেরই। সেই সোনালী দিনের অপেক্ষায় এতোটুকু ত্যাগ কিংবা ঝুঁকি কি আমরা নিতে পারিনা!! কিংবা নিদেনপক্ষে একটু উদারতা কি খুব বেশী হয়ে যায়!!     
 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যনইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

খেলার মাঠে দেয়াল ধসে দর্শক যুবকের মৃত্যু