আমি রিপোর্টারকে বিশ্বাস করতে চাই না

বই থেকে নেয়া

| ৩১ জুলাই ২০১৭, সোমবার
ও.ফা. : আপনাকে ডেকে তো তিনি কিছু হারাননি মি. কিসিঞ্জার। শুধু একটা অভিযোগ ছাড়া যে, আপনি নিক্সনের মানসিক পরিচর্যাকারী।
হে.কি. : এটা সম্পূর্ণভাবে কা-জ্ঞানহীন অভিযোগ। ভুললে চলবে না যে, আমাকে চেনার পূর্বে নিক্সন বৈদেশিক নীতির ব্যাপারে খুব তৎপর ছিলেন। নির্বাচিত হবার পূর্বেও বৈদেশিক নীতি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এ সম্পর্কে তার স্বচ্ছ ধারণা আছে। তিনি খুব সাহসী লোক।
প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে দু’বার মনোনয়ন না পেলে কেউ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারে না। দুর্বল লোক দীর্ঘদিন রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারে না। কারো হাতিয়ার হিসেবে কেউ দু’বার প্রেসিডেন্ট হতে পারে না।
ও.ফা. : “আপনি কি নিক্সনকে পছন্দ করেন মি. কিসিঞ্জার?
হে.কি. : তার প্রতি আমার প্রচুর শ্রদ্ধা রয়েছে।
ও.ফা. : লোকে বলাবলি করে যে, নিক্সনকে আপনি পাত্তাই দেন না। চাকরিটাই আপনার কাছে বড়। তারা বলে, যে কোনো প্রেসিডেন্টের অধীনে আপনি একাজ করতে পারবেন।
হে.কি. : নিক্সনের সঙ্গে যে দায়িত্ব পালন করেছি, অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তা করতে পারবো কিনা সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। নিক্সনের অধীনে যেসব কাজ করেছি তা সম্ভব হয়েছে তিনি সম্ভব করে দিয়েছেন বলেই।
ও.ফা. : আপনি তো আরো ক’জন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ছিলেন এমনকি যারা নিক্সনের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। আমি কেনেডী, জনসনের কথা বলছি...
হে.কি. : আমি সবার কাছে চাকরি গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমার মতামত ব্যক্ত করেছি। আমার চিন্তাভাবনা সবিস্তারে বলেছি। তারা কোন দলের লোক তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিল না। একই স্বাধীনতা নিয়ে আমি কেনেডি, জনসন ও নিক্সনের প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। সবাইকে একই পরামর্শ দিয়েছি। এটা সত্য যে, কেনেডির সাথে মতৈক্যে পৌঁছা একটু অসুবিধাজনক ছিল। আমি যে তার সাথে পুরোপুরি একাত্ম হতে পারিনি তা আমার দোষেই। তখন অবশ্য আমি এতটা পরিপক্ব ছিলাম না। আমি ছিলাম খ-কালীন উপদেষ্টা যখন অন্যদের সাথে প্রেসিডেন্টের সপ্তাহের সাত দিনই দেখা হয় তখন সপ্তাহে মাত্র দু’দিনের সাক্ষাতে প্রতিদিনের নীতির উপর প্রভাব ফেলা যায় না। আসলে কেনেডি ও জনসনের সাথে আমার এখনকার দায়িত্ব তুলনীয় নয়।
ও.ফা. : মেকিয়াভেলীয় আশ্রয় নেবেন না ড. কিসিঞ্জার।
হে.কি. : কিন্তু ওকথা কেন?
ও.ফা. : আপনার কথায় কেউ বিস্মিত হবে এটা ভেবে নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের উপর আপনার প্রভাব কতখানি বরং বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, আপনার উপর মেকিয়াভেলীর প্রভাব কতটুকু?
হে.কি. : কোনোভাবেই তার প্রভাব নেই। আধুনিক বিশ্বে মেকিয়াভেলীর তত্ত্বের খুব কমই গ্রহণ বা কাজে লাগানো সম্ভব। মেকিয়াভেলীর একটি বিষয় আমার কাছে ভালো লাগে, তাহলো রাজপুত্রের ইচ্ছাকে বিবেচনা করার পদ্ধতি। ভালো লাগার অর্থ আমাকে প্রভাবিত করা নয়। তুমি যদি জানতে চাও যে, আমার উপর কার প্রভাব সবচেয়ে বেশি, তাহলে আমি দুজন দার্শনিকের নাম বলবো: স্পিনোজা ও কান্ট। তুমি যে মেকিয়াভেলীর সাথে আমাকে জড়িত করছো তাতে আমারই অবাক লাগছে। লোকে বরং আমার সাথে মেটারনিকের নামকে জড়িত করে, যা রীতিমতো শিশুসুলভ। আমি মেটারনিকের উপর একটা গ্রন্থ রচনা করেছি। এই পর্যন্তই। মেটারনিক ও আমার মধ্যে কোথাও মিল নেই। তিনি চ্যান্সেলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এমন এক সময়ে যখন ইউরোপের কেন্দ্রস্থল হতে অন্য কোনো মহাদেশে যেতে তিন সপ্তাহ লাগতো এবং যখন যুদ্ধ পরিচালিত হতো পেশাদার সৈন্যদের দ্বারা এবং কূটনীতি ছিল অভিজাতদের হাতে। বর্তমান পরিস্থিতির সাথে তখনকার কোনো সামঞ্জস্য নেই।
ও.ফা. : ড. কিসিঞ্জার আপনি ছায়াছবির নায়কদের মতো যে খ্যাতি অর্জন করেছেন, তা কিভাবে উপভোগ করেন। আপনি যে একজন প্রেসিডেন্টের চেয়েও বিখ্যাত ও জনপ্রিয় সেটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করেন। এ ব্যাপারে কি আপনার নিজস্ব কোনো তত্ত্ব আছে?
হে.কি. : তা আছে। কিন্তু তোমাকে বলবো না। কারণ এটা অধিকাংশ লোকের তত্ত্বের সাথে মিলবে না। যেমন, বুদ্ধির তত্ত্ব। ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বুদ্ধি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। একজন রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি নিজে আমার কাজগুলো করবেন তাকে খুুব বুদ্ধিমান না হলেও চলবে। আমার তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু তোমাকে বলবো না। তার চেয়ে তোমার তত্ত্বটা আমাকে বলো। আমার জনপ্রিয়তার কারণ সম্পর্কে তুমিও যে একটা তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছো, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
ও.ফা. : আমি নিশ্চিত নই ড. কিসিঞ্জার। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তত্ত্বটি খুঁজে পেতে চাই। কিন্তু পাচ্ছি না।
হে.কি. : আমি সব সময় একা কাজ করেছি। আমেরিকানরা এটা খুব পছন্দ করে। আমেরিকানরা কাউবয়দের পছন্দ করে, যারা একাকী তার ঘোড়ায় চেপে শহরে, গ্রামে ঘুরে বেড়ায়, ওয়াগন পরিচালনা করে। সঙ্গে শুধু তার ঘোড়া, আর কিছু নয়। হতে পারে পিস্তলও তার কাছে নেই। সে কর্মতৎপরÑ এটাই যথেষ্ট। যথাসময়ে তাকে যথাস্থানে পাওয়া যায়।
ও.ফা. : তাহলে তা আপনি নিজেকে হেনরী ফ-ার মতো ভাবেন। নিরস্ত্র কিন্তু তার মুষ্টি ও সৎ আদর্শ নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। একা, সাহসী...
হে.কি. : সাহসের প্রয়োজনও নেই। প্রয়োজন একা থাকার এবং সকলকে প্রদর্শন করা যে সবকিছু সে একাকী করতে পারে। একা থাকা সবসময় আমার বৈশিষ্ট্য। আমার কৌশল। এর সাথে রয়েছে আমার স্বাধীনতা। এগুলো আমার মধ্যে এবং আমার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। এসব কিছুর উপর হচ্ছে দৃঢ়তা। আমি সব সময় নিশ্চিত থাকি যে আমি যা কিছু করেছি তা আমাকে করতে হতো। আমার প্রতি যে মানুষের বিশ্বাস রয়েছে তার প্রতি আমার খেয়াল রয়েছে। জনগণকে দ্বিধাগ্রস্ত করতে আমি পছন্দ করি না। অবশ্য জনমত আমাকে কখনো বিচলিত করেনি। আমি জনপ্রিয়তা চাই না, জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্যে কিছু করি না। জনসমর্থন হারাবার কোনো ভয় আমার নেই। যা আমি ভাবি তা আমি বলতে পারি। জনগণের প্রতিক্রিয়া দ্বারা নিজেকে বিচলিত হতে দিই না। অভিনেতাদের লক্ষ্য করুন। ভালো অভিনেতা শুধু কৌশলের ওপর নির্ভর করে না। একটা কৌশল তারা অনুসরণ করে, একই সঙ্গে সক্রিয় থাকে তাদের দৃঢ়তা। আমার মতো তারাও খাঁটি। কিন্তু চিরদিন একই কৌশল খাটে না। তবু যখন প্রয়োজন তখনকার জন্য যথার্থ।
ও.ফা. : আপনি কি বলতে চান যে, আপনি একজন স্বতঃস্ফূর্ত মানুষ। মেকিয়াভেলীর সাথে তুলনাই সঙ্গত ছিল, এখন মনে হচ্ছে আপনি ঠা-া অংকবিদের সাথে তুলনীয়, দুঃখজনকভাবে স্বনিয়ন্ত্রিত। আমার যদি ভুল না হয়, আপনি খুব শীতল মানুষ ড. কিসিঞ্জার।
হে.কি. : চাতুর্যে না হলেও কৌশলে শীতল। আসলে আমি কল্পনা বা চিন্তাভাবনার চেয়ে মানুষের সাথে সম্পর্কে বেশি বিশ্বাস করি। আমার চিন্তা ব্যবহার করি, কিন্তু আমার প্রয়োজন মানবিক সম্পর্ক। আমার জীবনে যা কিছু ঘটেছে তা কি সহসা ঘটেনি? আমি সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন প্রফেসর ছিলাম। এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত হয়েছি। আমি সব সময় স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত দ্বারা পরিচালিত হয়েছি। কেউ বলতে পারে যে, যা ঘটার ছিল তাই ঘটেছে। কেউ একথা বলে না যে, যা ঘটেনি তার ইতিহাস লিখা হয় না। আমি আমার লক্ষ্যে বিশ্বাস করি।
ও.ফা. : অভিনয় আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও খ্যাতির অনেকখানি আপনার প্রাপ্য নয় বলে আমার বিশ্বাস।
হে.কি. : একথা আংশিকভাবে অতিরঞ্জিত। কিছুটা সত্যি। নারীর প্রতি আমি কতটা নিবেদিত, এটা যদি বিবেচনা করি বলতে হবে, নারী আমার জীবনে কতখানি জুড়ে আছে। আমার কাছে নারী শুধু প্রমোদের জন্য, বলা যায় একটা হবি। কেউই তার হবি’র পিছনে প্রচুর সময় ব্যয় করতে পারে না। আমি খুব সীমিত সময় নারীর সাহচর্যে কাটাই। আমার কার্যসূচির দিকে দেখলেই তুমি তা বুঝতে পারবে। আমি মাঝে মাঝে আমার দুই সন্তানকে দেখতে যাই। আমরা একত্রে ক্রিসমাস এবং গুরুত্বপূর্ণ ছুটির দিনগুলো অতিবাহিত করি এবং গ্রীষ্মের বেশ কয়েক সপ্তাহ আমরা একসাথে থাকি। মাসে একবার বোস্টনে যাই ওদেরকে দেখতে। তুমি নিশ্চয়ই জান যে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে আমি বিপতœীক। বিপতœীক থাকায় আমি অস্বস্তিতে কাটাই না। সন্তানের সাথে বাস না করায় আমার মধ্যে অপরাধবোধের জটিলতা সৃষ্টি করে না। আমার বৈবাহিক জীবন শেষ হওয়াটাই যৌক্তিক হয়েছে। আমি যখন আমার সন্তানদের মায়ের স্বামী ছিলাম, তখনকার চেয়ে বরং এখনই সন্তানদের সাথে বেশি ঘনিষ্ঠ। তাদের সাথে এখন আমি অনেক সুখী।
ও.ফা. : ড. কিসিঞ্জার, আপনি কি বিয়ে বিরোধী?
হে.কি. : বিয়ে করবো কি করবো না, নীতির প্রশ্নে সেই সংকট নিরসন করা সম্ভব। হতে পারে যে, আমি পুনরায় বিয়ে করবো... হ্যাঁ, তা হতেও পারে। কিন্তু আমার মতো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির পক্ষে কারো সাথে বাস করা এবং একত্রে ঘর করা খুবই মুশকিল। অনিবার্যভাবেই জটিল। একজনকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। এই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া আমি একজন রিপোর্টারকে বিশ্বাস করার মতো লোক নই।
ও.ফা. : তাই তো মনে হয় ড. কিসিঞ্জার। আমি কখনো এমন কারো সাক্ষাৎকার নিইনি, যিনি প্রশ্ন এড়িয়ে যান। আপনি কি লাজুক?
হে.কি. : হ্যাঁ, কিছুটা তাই। তাছাড়া আমার মনে হয়, আমি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তি। অনেকে ভাবে আমি রহস্যময়, যন্ত্রণাদায়ক চরিত্র। অনেকে আমাকে সদা উৎফুল্ল বলে বর্ণনা করে, সদা হাস্যময়। এই দু’টি ভাবমূর্তির ধারণাই ভুল। দু’টোর একটাও আমি নই। আমি তোমাকে বলবো না, আমি কি। আমি কাউকে সে কথা বলিনি।
[ওয়াশিংটন, নভেম্বর, ১৯৭২]
(চলবে)
 

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যানইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

খেলার মাঠে দেয়াল ধসে দর্শক যুবকের মৃত্যু