ইন্দিরার মুখোমুখি ওরিয়ানা ফালাচি

বই থেকে নেয়া

| ১ আগস্ট ২০১৭, মঙ্গলবার
এই সেই অতিমানবী যিনি প্রায় অর্ধশত কোটি লোককে শাসন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের বিরোধিতার মুখে একটি যুদ্ধে বিজয়লাভ করেছেন। তাকে দেখেই কেউ ভাববে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিজয়ী হওয়ার কারণে কেউ তাকে আসনচ্যুত করতে পারবে না। অনেকে বলে, তিনি বিশ বছর ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। আমি তাকে পছন্দ করতাম একটি নজির হিসেবে যে একজন ভালো নারী যখন দেশ শাসন করে তখন তিনি কেমন হতে পারেন। আমি তার প্রশংসা করতাম। যারা তাকে সন্দেহ করে আমাকে সতর্ক করতো আমি তাদেরকে তার মেধা ও সাফল্যের কারণে ঈর্ষাকাতর ভাবতাম।
১৯৭৫-এর বসন্তকালে তিনি গণতন্ত্র পরিত্যাগ করে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন।
তিনি তার পিতার ভূমিকা বিস্মৃত হয়েছিলেন। তার বিচার হয়েছিল, সাজা হয়েছিল নির্বাচনী অভিযানে বাড়াবাড়ি করার অভিযোগে। এক পর্যায়ে তাকে পদত্যাগ করার বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়েছিল। পদত্যাগ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল তবু তিনি পদত্যাগ করেননি। নিক্সন যা করেছিলেন তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা থেকে স্বেচ্ছাচারী ইন্দিরায় পরিণত হন। রাতারাতি সক বিরোধী নেতাকে গ্রেপ্তার করেন, সংবিধান লঙ্ঘন করেন এবং স্বাধীনতাকে হত্যা করেন।
অনেকে তাকে পছন্দ করতো না। অনেকে তার অন্ধ ভক্ত ছিল। আমি পছন্দ করতাম, কারণ ভারতের মতো একটি জটিল দেশ শাসন সন্নাসীর পক্ষে সম্ভব নয়। ক্ষমতা সম্পর্কে হেনরি কিসিঞ্জার যাই বলুন না কেন (“একজন রাষ্ট্র প্রধানের জন্যে বুদ্ধিমত্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে যোগ্যতা একজন রাষ্ট্র প্রধানের থাকা জরুরি তা হলো শক্তি। সাহস, ধূর্ততা এবং শক্তি”) ভারতের মতো একটি দেশ শাসন যিনি করবেন তাকে অবশ্যই বুদ্ধিমান হতে হবে। ইন্দিরা গান্ধী খাঁটি সন্ন্যাসী ছিলেন না। জীবনের পেয়ালা থেকে কি করে পান করতে হবে সে বোধ তার পুরোপুরিই ছিল। তাকে বুঝার চেয়ে তার সাক্ষাতকার গ্রহণ সহজতর। আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, ব্যক্তিগত প্রসঙ্গেও তিনি স্বতঃস্ফূর্ত। তিনি কিছুই গোপন করেন না। তার কণ্ঠে জাদু, মুখটাও সুন্দর। আয়ত সুন্দর চোখে যেন একটু বেদনার ছায়া। তার চেহারাকে কারো সাথে মিলানো যায় না।
তিনি খুব সাধারণ মহিলা নন। প্রথমত তিনি জওয়াহের লাল নেহেরুর কন্যা। দ্বিতীয়ত তিনি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর শিষ্য। তাদের ছায়া তিনি বড় হয়েছেন, শিক্ষালাভ করেছেন এবং নিজেকে গঠন করেছেন। নেহেরু পরিবার, বংশ পরম্পরায় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। তার ঠাকুরদা কংগ্রেস পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তার পিসী বিজয়লক্ষ্মী প-িত একমাত্র মহিলা যিনি জাতিসংঘে সভানেত্রীত্ব করেছেন। ইন্দিরা যখন শিশু তখন শুধু মহাত্মা গান্ধীর কোলেই নয়, যারা ভারতের জন্ম দিয়েছেন সেইসব সকল গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কোলে বসেছেন।
আর চোখের সামনে শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। এমন গল্পও আছে যে, বন্ধুদের জন্য বাড়ির দরজা খুলে তাকে বলতো হতো, “দুঃখিত বাড়িতে কেউ নেই। আমার বাবা মা, ঠাকুরদা, ঠাকুরমা, পিসী সবাই জেলে।” এ অবস্থার কারণে মাত্র আট বছর বয়সে পড়াশোনার জন্য তাকে সুইজারল্যান্ড পাঠানো হয়। কিন্তু তের বছর বয়সে দেশে ফিরে এসে তিনি ক্ষুদে গেরিলা বাহিনী গঠন করেন। তারা বার্তা বহন করতো, কখনো কখনো বৃটিশ ব্যারাকে হানা দিতো। জেল থেকে নেহেরু তাকে লিখতেন, “তোমার কি মনে পড়ে যখন প্রথম জোয়ান অব আর্কের গল্প পড়ে তুমি কতটা উৎসুক হয়েছিলে এবং তোমার লক্ষ্যও অনেকটা তার মতো ছিল।... ভারতে আজ আমরা ইতিহাস পড়ছি এবং তুমি ও আমি ভাগ্যবান যে এ ইতিহাস সৃষ্টি হবে আমাদের চোখের সামনে।”
তিনি জেলে গেছেনÑ তের মাস। অক্সফোর্ডে পড়াশোনার সময় বোম্বের তরুণ আইনজীবী ফিরোজ গান্ধীর সাথে তার সাক্ষাত হয়। ১৯৪২ সালে দিল্লিতে তাদের বিয়ে হয়। এর ছয়মাস পর বৃটিশ সরকার দুইজনকেই গ্রেপ্তার করেন এবং তাদের অসুখী দাম্পত্য জীবনের শুরু এখানেই। ১৯৪৭ সালে নেহেরু প্রধানমন্ত্রী হলে ইন্দিরা পিতার সাথে বসবাস করতে থাকেন। বিপতœীক পিতার পাশে একজন নানীর উপস্থিতি তিনি অনুভব করছিলেন। ফিরোজ গান্ধী ১৯৬০ সালে তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ইন্দিরার এই সিদ্ধান্তকে মেনে নেননি। পিতা-কন্যা একত্রে ভ্রমণ করতেন, রাষ্ট্র প্রধানদের অভ্যর্থনা জানাতেন। ১৯৬৪ সালে পিতার মৃত্যুর পর ইন্দিরা তার স্থলাভিষিক্ত হলেন।
আমি সরকারি প্রাসাদে তার অফিসে সাক্ষাত করলাম। এ অফিসে তার পিতাও বসতেনÑ বিশাল শীতল ও মসৃণ। একটি শূন্য ডেস্কের পিছনে তিনি বসেছিলেন। আমি প্রবেশ করতেই তিনি উঠে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। পুনরায় আসনে গিয়ে বসার পর তাকালেন, মনে হলো তিনি বলছেন, তোমার প্রথম প্রশ্ন শুরু কর, সময় নষ্ট করো না। নষ্ট করার মতো সময় আমারও ছিল না। প্রথমে বেশ সতর্কতার সাথে উত্তর দিচ্ছিলেন। এরপর ফুলের মতো নিজেকে ছড়িয়ে দিলেন এবং আমাদের আলোচনার আর বাধা রইলো না। দুই ঘণ্টার উপর আমরা একত্রে ছিলাম। সাক্ষাতকারটি যখন শেষ হলো, তিনি আমাকে ট্যাক্সিতে তুলে দেয়ার জন্য রাস্তা পর্যন্ত এলেন। আমার হাতটা ধরে রেখেছিলেন তিনি যেন আমরা পূর্ব পরিচিত।
আটচল্লিশ ঘণ্টা পর আমি সাক্ষাতকারে কিছু অসঙ্গতি দেখে আবার তার সাথে দেখা করতে চাইলাম এবং কোন আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই তার বাড়িতে গেলাম। এটা একটা মাঝারি মানের বাংলো। দুই ছেলে রাজীব ও সঞ্জয়ের সাথে এখানে থাকেন তিনি। এখানে তার সাথে সাক্ষাত করা খুব সহজ। সকালে তার কাছে বহুলোক আসে দরখাস্ত, প্রতিবাদ, ফুলের তোড়া নিয়ে। কলিং বেল বাজাতে সেক্রেটারি দরজা খুললো। জানতে চাইলাম প্রধানমন্ত্রী আমাকে আর আধ ঘণ্টা সময় দিতে পারবেন কিনা? সেক্রেটারি ভিতরে গেলো এবং ইন্দিরা তার সাথে এলেন। আমরা বসলাম এবং আরো এক ঘণ্টা আলাপ করলাম। প্রশ্নের উত্তর ছাড়াও তিনি আমাকে ছেলে রাজীব সম্পর্কে বললেন, সঞ্জয় সম্পর্কেও বললেন। শেষে তিনি ছোট বালককে ডেকে বললেন, “এ হচ্ছে আমার নাতি, একেই আমি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি”
ওরিয়ানা ফ্যালাচি : মিসেস গান্ধী আপনার জন্য আমার বহু ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। ব্যক্তিগত প্রশ্নগুলো পরেই করবো।
এখনকার প্রশ্ন হচ্ছেÑ বহু লোক কেন আপনাকে ভয় করে এবং বলে আপনি খুব শীতল, বরফের মতো, কঠোর...।
ইন্দিরা গান্ধী : তারা বলে, কারণ আমি নিষ্ঠাবান। আমি শুধু সুন্দর কথা বলে সময় নষ্ট করি না, ভারতের লোকজই. গা.ধারণত যা করে প্রথম আধঘণ্টা ব্যয় করে সৌজন্য বিনিময়ের মাধ্যমে। ‘আপনি কেমন আছেন, ছেলেমেয়ে কেমন আছে, নাতিনাতনিরা কেমন ইত্যাদি। আমি এসব এড়িয়ে চলি। আসল কাজ করার পর সৌজন্য বিনিময় হতে পারে। কিন্তু ভারতের লোকেরা এই দৃষ্টিভঙ্গি হজম করতে পারে না। যখন আমি বলি, তাড়াতাড়ি কাজের কথায় আস। তখন তারা আহত হয় এবং ভাবে আমি অত্যন্ত শীতল, কঠোর। আমি যা সেভাবেই আমি সকলতে বুঝতে দেই। যদি আমি সুখী হই, তাহলে আমাকে সুখীই দেখা যায়। রাগান্বিত হলেও তা আমি প্রকাশ করি। অন্যদের তাতে কি প্রতিক্রিয়া হয় সে ব্যাপারে আমি তোয়াক্কা করি না। আমার মতো কঠোর জীবন যাকে কাটাতে হয় তার পক্ষে অন্যের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে ভাবা সম্ভব নয়।
ও. ফা. : আমি কঠিন একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করবো। আপনি একটি যুদ্ধ জয় করেছেন, জয়ের চেয়েও অধিক। কিন্তু আমাদের খুব কম লোকই এটাকে বিপজ্জনক বিজয় বলে মনে করেন। আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ আপনার কাক্সিক্ষত মিত্র হবে? বরং তার বদলে এক অস্বস্তিকর বোঝায় পরিণত হতে পারে বলে কি আপনি ভীত নন?
ই. গা. : দেখো, জীবন সময় বিপদে পরিপূর্ণ এবং আমি মনে করি না যে, কারো পক্ষে বিপদ এড়ানো সম্ভব। যা সঠিক মনে হয়, একজনের তাই  করা উচিত এবং সেই যথার্থ কাজ করতে যদি বিপদ আসে তাহলে বিপদের ঝুঁকি অবশ্যই নিতে হবে। এটাই আমার সব সময়ের দর্শন। আমি পরিণতির কথা ভেবে কোন পদক্ষেপ নেই না। পরিণতিগুলো পরে পরীক্ষা করে দেখি। যখন কোন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, আমি তা মোকাবেলা করি। তুমি এই বিজয়কে বিপজ্জনক বলছো, কিন্তু আমি বলছি, কেউ এ যাবত এটাকে বিপজ্জনক বলেনি এবং ঝুঁকিও আমি দেখি না। যদি ঝুঁকি বাস্তবে পরিণত হয় তাহলে সে বাস্তবতার আলোকেই পদক্ষেপ নেব। আমি তোমার প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর দিতে চাই। আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ ও আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। অবশ্যই তা একতরফা বন্ধুত্ব হবে না। প্রত্যেকের কিছু দেবার ও নেবার থাকে। আমরা যদি বাংলাদেশকে কিছু দিতে চাই তাহলে স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশ আমাদের কিছু নিতে চাইবে এবং বাংলাদেশ কেন তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবে না। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ সম্পদে পরিপূর্ণ এবং নিজ পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম। রাজনৈতিকভাবে আমার মনে হয় দেশটা যোগ্য লোক দ্বারা পরিচালিত। শরণার্থী, যারা এখানে আশ্রয় নিয়েছিল তারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে...।
ও. ফা. : তারা কি আসলে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে?
ই. গা. : হ্যাঁ, ২০ লাখ ইতিমধ্যেই ফিরে গেছে।
ও. ফা. : এক কোটির মধ্যে ২০ লাখ। খুব বেশি নয়।
ই. গা. : তা বেশি নয়, একটু সময় দাও। তারা দ্রুত ফিরে যাচ্ছে। দ্রুততার সাথে। এতে আমি সন্তুষ্ট। আমার ধারণার চেয়ে বেশি।
ও. ফা. : মিসেস গান্ধী, আপনার বিজয়ের বিপদ বলতে আমি শুধু বাংলাদেশকে বুঝাইনি। আমি পশ্চিমবঙ্গকেও বুঝাতে চেয়েছি। যেটা ভারতের অংশ এবং পশ্চিমবঙ্গ এখন স্বাধীনতার কথা বলছে। কোলকাতায় আমি নকশালীদের কথা শুনেছি ... এবং লেনিনের একটা কথা আছে, “সাংহাই ও কোলকাতা দিয়ে আন্তর্জাতিক বিপ্লব অতিক্রম করবে।”
ই. গা. : না, এটা সম্ভব নয়। বলতে পারো, কেন? কারণ ভারতে একটি বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে। সবকিছু বদলে যাচ্ছে। শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিকভাবে। এখানে কমিউনিজমের আতঙ্ক নেই। এ বিপদ থাকতো আমার বদলে একটা দক্ষিণপন্থি সরকার থাকলে। যখন জনগণ ভেবেছে যে আমার পার্টি দক্ষিণ ঘেঁষা হচ্ছে তখন কমিউনিস্টরা শক্তি অর্জন করেছে। কিন্তু এখন জনগণ অনেক সচেতন। আমাদের প্রচেষ্টা সম্পর্কে তারা দেখছে আমরা সমস্যার সমাধান করছি। কমিউনিস্টরা তাদের শক্তি হারাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে নকশালীদের তৎপরতা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশেও এ ধরনের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে। আমি কোন বিপদ আশঙ্কা করছি না।
ও. ফা. : ইতিমধ্যেই তারা আপনার কিছু অসুবিধা করেছে। স্বাধীনতার পর ঢাকায় আমি ভীতিকর হত্যাকা- প্রত্যক্ষ করেছি।
ই. গা. : প্রথম পাঁচদিনে এসব ঘটেছে এবং অপর পক্ষের হত্যাকা-ের তুলনায় তা সামান্য। অপরপক্ষের দশ লক্ষ মানুষ হত্যার তুলনায় খুব কম। এটা সত্য যে, কিছু দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে এবং আমরা তা ঠেকাতে চেষ্টা করেছি। তুমি কি জানো, আমরা কত লোকের প্রাণ রক্ষা করেছি? আমরা তো সর্বত্র যেতে পারি না, সবকিছু দেখতে পারি না। সকল সমাজে কিছু গ্রুপ থাকে, যারা অশিষ্ট। তাদেরকেও বুঝতে হবে। যথার্থ বুঝতে হলে প্রথম ক’দিনের মধ্যে কি ঘটেছে তা বিবেচনা করলে চলবে না। তারা বহু দিন, বহু মাস ধরে দেখেছে এবং দুর্ভোগ সহ্য করেছে।
ও. ফা. : মিসেস গান্ধী, আপনি তো এ অভিযোগ সম্পর্কে অবগত যে, আপনারা ভারতীয়রা যুদ্ধের প্ররোচনা দিয়েছেন এবং আপনারাই প্রথম হামলা করেছেন। এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে কি বলবেন?
ই. গা. : তুমি যদি পিছনের দিকে যেতে চাও, তাহলে এ কথা স্বীকার করে উত্তর দেবো যে, আমরা মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করেছি। সেই শুরুর মুহূর্ত থেকে ধরলে বলতে হয়, আমরাই শুরু করেছি। এ ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। আমরা এক কোটি শরণার্থীকে আমাদের ভূখ-ে রাখতে পারি না, আমরা একটা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে এ ধরনের একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সহ্য করতে পারি না। শরণার্থীর ঢল কখনো বন্ধ হতো না। একটা চূড়ান্ত বিস্ফোরণ পর্যন্ত এটা চলতেই থাকতো। এসব লোকের আগমন রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়তো। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এটা করতে হতো। এ কথাটাই আমি মি. নিক্সন এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে বলেছিলাম যুদ্ধ এড়াবার লক্ষ্যে।
কিন্তু প্রকৃত যুদ্ধ সূচনার দিকে লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে যে, পাকিস্তানিরাই হামলা করেছিল। আমাদের উপর বিমান নিয়ে আক্রমণ করেছিল। বিকেল পাঁচটায় আগ্রায় প্রথম বোমা বর্ষিত হয়। আমরা খুবই বিস্মিত হয়েছিলাম। একমাত্র সপ্তাহান্তেই আমরা সরকারের দায়িত্বশীলতা দিল্লি ছাড়তে পারি। প্রায় কেউই দিল্লি ছিল না। আমি গিয়েছিলাম কোলকাতায়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন পাটনায় এবং সেখান থেকে তার বাঙ্গালোরে যাওয়ার কথা। অর্থমন্ত্রী গিয়েছিলেন বোম্বে এবং সেখান থেকে তিনি পুনা ফিরতে হলো। এর ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাল্টা আঘাত হানার পরিবর্তে আমাদের বাহিনী পরের দিন আঘাত হানলো। এ জন্যে পাকিস্তানিরা কিছু এলাকা দখলে সফল হয়েছিল। আমরা প্রস্তুত ছিলাম, জানতাম কিছু একটা ঘটবে। আমরা শুধু বিমান হামলার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। তা না হলে পাকিস্তানিরা আমাদের পরাভূত করতো।
ও. ফা. : মিসেস গান্ধী, আপনি বলেছেন, যুদ্ধ এড়ানোর জন্য ইউরোপ ও আমেরিকা সফর করেছেন। আপনি কি সত্যি বলবেন কি ঘটেছিল? নিক্সনের সঙ্গে কি আলোচনা হয়েছিল?
ই. গা. : আমি জেনে শুনেই সফরে বেরিয়েছিলাম যে আমার অবস্থা শিশুর মতো, গর্তে অঙ্গুলি প্রবেশ করাচ্ছি এবং সেখানে কি আছে আমি জানি না। সত্যটা হলো, আমি স্পষ্টভাবে নিক্সনকে বলেছি সেই একই কথা যা আমি হীত, পম্পিডো, ব্রান্ডটকে বলেছি। আমি বলেছি, আমাদের পিঠের ওপর এক কোটি শরণার্থী নিয়ে আমরা আর পারছি না এবং এ ধরনের একটা অসহনীয় পরিস্থিতি আর সহ্য করা যায় না। মি. হীথ, মি. পম্পিডো এবং মি. ব্রান্ডট আমার কথা ভালোভাবেই উপলব্ধি করলেন, কিন্তু নিক্সন বুঝলেন না। অন্যেরা যা বুঝে নিক্সন তা বুঝেন না। আমি সন্দেহ করেছিলাম নিক্সন পাকিস্তানের সমর্থক অথবা বলা যায়, আমি জানতাম, আমেরিকানরা সব সময় পাকিস্তানের পক্ষে এবং ভারতের বিপক্ষে।
যা হোক, সাম্প্রতিককালে আমার মনে হচ্ছে, আমেরিকানরা বদলাচ্ছেÑ পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন কমছে তা নয়, ভারত বিরোধিতা কমছে। আমার ধারণা ভুল ছিল। নিক্সনের সাথে সাক্ষাতে আর যাই হোক যুদ্ধ এড়ানো যায়নি। এতে আমারই ভালো হয়েছে। অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি যখন কেউ তোমার বিরুদ্ধে কিছু করে, তাহলে তোমার পক্ষে কিছু সুবিধা চলে আসে। এটা জীবনের বিধান। আমি গত নির্বাচনে কেন বিজয় লাভ করেছি, জানো? কারণ জনগণ আমাকে ভালোবাসে, আমি কঠোর পরিশ্রম করি। আরো একটা কারণ হলো, বিরোধী দল আমার প্রতি ন্যক্কারজনক আচরণ করে। যুদ্ধে কেন জিতেছি, জানো? কারণ আমার সশস্ত্র বাহিনী বিজয়ে সক্ষম ছিল এবং আমেরিকানরা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল।
ও. ফা. : তা মানে?
ই. গা. : বলছি, শোন। আমেরিকা সব সময় ভেবেছে যে তারা পাকিস্তানকে সাহায্য করছে। আমেরিকা যদি পাকিস্তানকে সাহায্য না করতো, পাকিস্তান একটি শক্তিশালী দেশে পরিণত হতো।  (চলবে)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

‘আপাতত ভাত-রুটি থেকে দূরে আছি’

মা ও ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করলো যুবক

দেখা হলো কথা হলো

দল থেকে বহিষ্কার মুগাবে

‘রোহিঙ্গাদের নির্যাতন যুদ্ধাপরাধের শামিল’

আন্ডা-বাচ্চা সব দেশে, বিদেশে কেন টাকা পাচার করবো

জেনেভায় বাংলাদেশের পক্ষে থাকবে জাপান

প্রেমিকের সঙ্গে পালাতে গিয়ে কিশোরী ধর্ষিত

আসামি ‘আতঙ্কে’ সিলেটে আওয়ামী লীগ নেতারা

ত্রাণসামগ্রী বিক্রি করছে রোহিঙ্গারা

ভারতের সঙ্গে সম্প্রীতি নষ্ট করতেই রংপুরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা

সময় হলে বাধ্য হবে সরকার

কানাডার উন্নয়নমন্ত্রী আসছেন মঙ্গলবার

ব্যক্তির নামে সেনানিবাসের নামকরণ মঙ্গলজনক হবে না: মওদুদ

কায়রোয় আরব নেতাদের জরুরি বৈঠক

পুলিশি জেরার মুখে নেতানিয়াহু