সিগন্যালে রবি ঠাকুরের গান

লালবাতির নিয়ন্ত্রণে কলকাতার সড়ক

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, কলকাতা থেকে ফিরে | ২০ আগস্ট ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:২৭
১৯৯৯ সালের কথা বলছি। কলকাতা নিউ মার্কেট থেকে যাবো গোর্কি সদন। দাবার টুর্নামেন্টগুলো হয় এখানেই। বাংলাদেশের গ্রান্ড মাস্টার জিয়াউর রহমান খেলছেন। উদ্দেশ্য খেলা দেখতে যাওয়া। রাস্তায় গাড়ির লম্বা লাইন।
ঢাকার অভিজ্ঞতায় দেরি হয়ে যেতে পারে ভেবে আমার মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছিল। আমার ট্যাক্সিটি ডান দিকের লাইনে। পাশেই বাঁ দিকে রাস্তা ফাঁকা। আমি চালকের দিকে তাকিয়ে বললাম, দাদা বাঁ দিকে রাস্তা খালি আছে, আপনি টেনে যান না। চালক খানিকটা বিরক্ত হলেন আমার কথায়। পেছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, দাদা আমি নিয়ম কানুন বুঝি। চালকের কথা শুনে আমি খানিকটা বিব্রত ও অসহায় বোধ করলাম। বুঝলাম, এটা ঢাকা নয়। অপেক্ষায় থাকলাম কী হয় তা বোঝার জন্য। তাকিয়ে দেখলাম, শুধু আমার গাড়িই না। কোনো গাড়িই বাঁ দিকে যাচ্ছে না। আমার ট্যাক্সির পেছনেও লম্বা লাইন। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় যখনই সিগন্যাল পড়েছে অর্থাৎ লাল বাতি শেষে সবুজ বাতি জ্বলেছে দেখলাম এক টানে সব গাড়ি চলে গেল। আমার সবরকম ঔৎসুক্য এরপর থেকে কলকাতার ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ে। কারণ, শহরের বড় বড় রাস্তায়ও আমি পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ দেখিনি। তবে সব ক্রসিংয়ে রয়েছে পুলিশ কিয়স্ক। ছোট ছোট বক্সের মতো ঘরকেই বলা হয় কিয়ক্স। এত বড় শহর অথচ কি এমন শৃঙ্খলা যে যানজট হচ্ছে না। কখনো গাড়ি নিয়মের বাইরে থামছে না। বা নিয়মের বাইরে গিয়ে এলোপাতাড়ি চলছে না। সিগন্যাল বাতির এদিক-ওদিক হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই ছুটে চলছে। ১৯৯৯ থেকে ২০১৭। দেড় যুগ। এরমধ্যে ২০১৩ সালে একবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে কলকাতায়। কিন্তু পুরোদিন যেখানেই গেছি খুব বেশি ট্রাফিক পুলিশ চোখে পড়েনি। এবারও যে এর ব্যতিক্রম হয়েছে তা নয়। শুধু বড় বড় রাস্তায় দুতিন জন ট্রাফিক পুলিশ বা সার্জেন্ট চোখে পড়েছে। কোথাও কোথাও ট্রাফিক পুলিশের সহযোগী হিসেবে সিভিক পুলিশ। বছর দুযেক আগে সিভিক পুলিশের সূচনা। এদেরকে গ্রিন পুলিশও বলা হয়। শহরের বেকার যুবকদের দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয় সিভিক পুলিশে। শহরে নিয়মই এমন, কোনো গাড়িকে দেখিনি রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে থাকতে। বা সিগন্যাল বাতি অমান্য করেছে। পাগলের মতো নিয়ম মেনে সব গাড়ি চলছে। কলকাতা শহরে এখন প্রচুর ফ্লাইওভার বা উড়াল পথ নির্মিত হয়েছে। একই সঙ্গে নিচ দিয়ে যেমন গাড়ি চলছে আবার ওপর দিয়েও। তবে পুলিশের কর্তা ব্যক্তিদের মতে,  কলকাতা শহরে অনেক রাস্তায় ওয়ান ওয়ে বিধি চালু হওয়াতে গতি এসেছে ট্রাফিক চলাচলে। কলকাতা শহরে যে রাস্তায় আপনি সকালে যাচ্ছেন দুপুরে আবার সে রাস্তা দিয়ে আপনি যেতে পারবেন না। কারণ, একই পথে ফিরতে শহরে লাখ লাখ মানুষ দিনের প্রথমার্ধে ঢুকছে। আবার সেই একই পথ দিয়েই লোকজন দুপুরের পর ফিরতে শুরু করছে। প্রায় সকল রাস্তাই কলকাতায় ওয়ান ওয়ে। রাস্তাগুলো সময় সময়ে তার গতিপথ নির্দেশনা অনুযায়ী বদল করে। নিয়মিত যারা গাড়ি চালান এই রীতি তাদের মুখস্থ। যে কারণে কোনো রাস্তা গাড়ি নিয়ে স্থবির বা অসহায় অবস্থায় কখনোই দেখা যায়নি। এবারের ভ্রমণে একদিন কলেজ স্ট্রিট থেকে গোল পার্ক রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার আসতে গিয়ে দেখেছি মোবাইলে উঠেছে ২৫ মিনিট লাগবে। ঠিক ঠিক তাই। ২৫ মিনিট পরে আমরা পৌঁছে যাই গোলপার্কে। উবারের নির্দেশিত সময় মানা সম্ভব হয়েছে কেবল ট্রাফিক ব্যবস্থার কারণেই। আর যে সকল রাস্তার মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ তারা যেন একেকজন সেবকের ভূমিকায়। যখনই তাদের সহযোগিতা চেয়েছি এগিয়ে এসেছেন। অনেক সময় নিজ থেকে একাধিকবারও এসে বুঝিয়ে দিয়েছেন কিভাবে যেতে হবে। গোলপার্ক থেকে বেহালায় যাবো কোন গাড়িতে তা এসডি ৪ না এসডি ১৬ এটি নিশ্চিত করতে ট্রাফিক পুলিশ যেভাবে বুঝালেন তা আমাদের এখানে সত্যিই আশাতীত। এ যাত্রায় আমাদের বাস ছিল গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের কালচারাল ইনস্টিটিউটের ইন্টারন্যাশনাল স্কলার হোস্টেলে। জানালা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়তো গড়িয়াহাট থেকে দক্ষিণাপন যাওয়ার রাস্তা। এক মুহূর্তও গাড়ির গতি থমকে আছে তা দেখিনি। আর সকল গলিপথ থেকে গাড়ি বের হতেই দেখেছি সিগন্যাল বাতি অনুসরণ করতে। একটি হোন্ডা, অটো বা ট্যাক্সি কেউই সিগন্যাল বাতি অমান্য করেনি। আর কলকাতায় সরকারি দল বা বিশেষ সুবিধাভুক্ত কোনো শ্রেণি নেই। যারা চাইলে তার মতো করে রাস্তায় চলাচলের নিয়ম করে নেয়। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িগুলো সবসময় উল্টো পথে চলাচল করে। একইভাবে যারা আইন মানতে বাধ্য করেন সেই পুলিশ বাহিনী বেশিরভাগ সময় উল্টো পথে চলেন। আমাদের মন্ত্রীরাতো এটা তাদের হক মনে করেন। কলকাতায় এসবই অকল্পনীয়। আমাদের এখানে মহল্লা কেন বড় রাস্তায়ও যেভাবে গাড়ি থেমে থাকে বা যাত্রী নিয়ে হল্লা করে তা কলকাতায় কল্পনায়ও ভাবা সম্ভব নয়।
ট্রাফিক পুলিশে নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ
কলকাতায় ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামলে যাত্রী এবং চালকদের স্বস্তি দিতে অভিনব সব পদ্ধতির কথা চিন্তা করা হচ্ছে। যাত্রাপথের বিরক্তিকর অপেক্ষার মুহূর্তেও স্বস্তি দিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্যোগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গান শোনাবার ব্যবস্থা হয়েছে। কলকাতার রাস্তায় কোথাও ট্রাফিক সিগন্যালের আলো লাল হলেই বেজে উঠছে কবিগুরুর গান। এতে করে সিগন্যালে দাঁড়ালেও মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশকে আরও যুগোপযোগি করতে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
ট্রাফিক পুলিশ যেন কাজে ফাঁকি না দিতে পারেন তার জন্য নেয়া হয়েছে নতুন ব্যবস্থা। প্রত্যেক ট্রাফিক সার্জেন্টের ইউফির্মের সঙ্গে বডি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থার ফলে ট্রাফিক পুলিশের গাফিলতি খেয়াল রাখা হবে। এই বডি ক্যামেরার সঙ্গে সরাসরি যোগ থাকছে ট্রাফিক গার্ড সিস্টেমের। আর সেখান থেকে সহজেই নোট নেয়া যাবে প্রত্যেকে ট্রাফিক সার্জেন্টের কাজের। তাছাড়া অপরাধ রুখতে ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে ১৫০টি জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে ৪০০টি শক্তিশালী নজরদার ক্যামেরার ‘সিটি সাভির্ল্যান্স সিস্টেম’।
অবশ্য কলকাতার ট্রাফিক সার্জেন্টদের হাতে রয়েছে আইনভঙ্গকারী চালকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবার ক্ষমতা। আর পথে পথে এদের নজরদারি থেকে রেহাই নেই আইনভঙ্গকারীদের। নানা ধরণের আইন ভাঙার জন্য নানা পরিমাণ অর্থের জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি গাড়ি মালিকদের অনলাইন ব্যবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে কোন আইন ভঙ্গ করেছে গাড়ি এবং কোথায়, কখন। সঙ্গে জরিমানার পরিমাণ। নির্দিষ্ট সময়ে সেই জরিমানার অর্থ জমা না দিলে তা আদালত পর্যন্ত গড়াচ্ছে।
বেআইনি পার্কিং বন্ধ করতে চালু করা হয়েছে গাড়ির চাকায় বেড়ি পড়ানোর ব্যবস্থা। এই বেড়ি খোলা সহজ নয়। অগত্যা ট্রাফিক পুলিশের কাছে যেতেই হবে। কলকাতায় ফুটপাত এতোটাই চওড়া যে এর বহুরকম ব্যবহার চোখে পড়েছে। গাড়ি দাঁড়াবার জন্য ছায়ার ব্যবস্থা যেমন আছে ঠিক তেমনি যাত্রীদের বসার জন্য নানান ধরণের চেয়ারের ব্যবস্থাও । সবচেয়ে বড় বিষয় পরিচ্ছন্নতা। পথে-পথে যাত্রীদের সুবিধার জন্য চালু হয়েছে শীততাপনিয়ন্ত্রিত বাস। রাস্তার ডিভাইডারে লাগানো হয়েছে নানা ধরণের গাছ। সর্বত্রই রঙের ছোপ। নির্দিষ্ট সময় অন্তর সেইগুলি ধোয়া মোছাও চলে পরিচ্ছন্ন রাখতে।  
কলকাতায় চলার পথে গাড়ি নেই তা নয়। বরং গাড়ির চাপ ক্রমশ বাড়ছে। তবে শহরের বিন্দ্রেীকরণের ফলে পিক আওয়ার্সে যান জটের ঝক্কি অনেকটাই সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসেই মহাকরণকে নিয়ে গেছেন গঙ্গার ওপারে নবান্নে। এতে করে মধ্য কলকাতায় সরকারি অফিসে লোকজনের বাড়তি যে ভিড় ছিল তা চলে গেছে নবান্নে। অন্যদিকে সল্টলেকের বাসিন্দাদের কলকাতায় আসতে হয় শুধু প্রয়োজনীয় কাজে। কারণ, শপিংমল, সিনেপ্লেক্স, হাসপাতালসহ কম্পিউটার প্রযুক্তির বড় অফিসগুলো এখন রয়েছে সল্টলেকেই। ফলে অভিজাত একটি বড় শ্রেণির লোকদের মধ্য কলকাতায় কমই আসতে হয়। আর বাড়তি যানজটের চাপও অনেকটাই কম। নানান ধরণের বাহন আপনার পেতে কোন সমস্যা হবে না। রয়েছে উবার, ওলা, হলুদ ট্যাক্সি, ট্রাম, মেট্রো রেল, অটোসহ নানান ধরনের বাস। কিছু না কিছু আপনি পাবেনই। তবে কিছু সমস্যা যে নেই তা নয়। দু’একবার আমাদেরও বাড়তি রুপি গুনতে হয়েছে অপরিচিত বলে। তবে তা স্থানীয়দের ক্ষেত্রে একেবারেই অসম্ভব।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Mehedi hasan Joseph

২০১৭-০৮-১৯ ২২:১২:৩২

খুব ভাল লিখেছেন, একমত

আপনার মতামত দিন

‘আপাতত ভাত-রুটি থেকে দূরে আছি’

মা ও ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করলো যুবক

দেখা হলো কথা হলো

দল থেকে বহিষ্কার মুগাবে

‘রোহিঙ্গাদের নির্যাতন যুদ্ধাপরাধের শামিল’

আন্ডা-বাচ্চা সব দেশে, বিদেশে কেন টাকা পাচার করবো

জেনেভায় বাংলাদেশের পক্ষে থাকবে জাপান

প্রেমিকের সঙ্গে পালাতে গিয়ে কিশোরী ধর্ষিত

আসামি ‘আতঙ্কে’ সিলেটে আওয়ামী লীগ নেতারা

ত্রাণসামগ্রী বিক্রি করছে রোহিঙ্গারা

ভারতের সঙ্গে সম্প্রীতি নষ্ট করতেই রংপুরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা

সময় হলে বাধ্য হবে সরকার

কানাডার উন্নয়নমন্ত্রী আসছেন মঙ্গলবার

ব্যক্তির নামে সেনানিবাসের নামকরণ মঙ্গলজনক হবে না: মওদুদ

কায়রোয় আরব নেতাদের জরুরি বৈঠক

পুলিশি জেরার মুখে নেতানিয়াহু