বারাসাত যেন এক টুকরো বাংলাদেশ

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, কলকাতা থেকে ফিরে | ২৩ আগস্ট ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:৪২
এবারের কলকাতা যাওয়ার নানা কারণের মধ্যে একটি ছিল নীলদার সঙ্গে দেখা হবে। শেষ ঢাকা সফরের সময় ঢাকা কেন্দ্রের এক আড্ডায় নীলদার কথাটা খুব মনে বিঁধেছিল। সেটা ছিল নীলদার সঙ্গে আমার ঢাকায় দ্বিতীয় দেখা। প্রথম দেখার পর থেকে দাদা কেন জানি আপন করে নিয়েছেন। এটা যে আমার বেলায় তা নয়। দাদার কথায়, দাদার লেখায় বাংলাদেশের সুর বাজে সবসময়।
আমার নেয়া দাদার সাক্ষাৎকার আর মানবজমিন ঈদ সংখ্যায় লেখা স্মৃতিতে ঘুরেফিরে দেশমাতৃকার প্রতি দাদার যে দরদ দেখি তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। ২৭শে জুলাই বিকালে প্রয়াত অমিত বসুর বাসা থেকে ফেরার পথে আমাদের পথনির্দেশক। শুধু পথ নির্দেশক বললে ভুল হবে। শ্রৌতোষি বরাবরের মতো এবারও দদদম থেকে আমাদের গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে দিয়েছে গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে। পরদিন শ্রোতোষি টিপ টিপ বৃষ্টিতে গাড়ি চালিয়ে অমিত বসুর বাড়িতে নিয়ে যায়। পরে যখন শুনলাম পাশেই রয়েছে বেলেঘাটা। মনে পড়লো নীলদার বাসাতো এখানেই। তবে আর বাদ যাবে কেন? নীলদাকে ফোনে ধরতেই কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাই আমরা। আর বৃষ্টির মধ্যে দাদাকে দেখি ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে রাস্তায়। বলা নেই কওয়া নেই অকস্মাৎ হাজির হওয়া এই মানুষটির আপ্যায়ন আড্ডায় মনে হলো তিনি আর যাই হোক কলকাতার হতে পারেননি। যা হোক দাদার বাসায় বসেই চূড়ান্ত হলো বারাসাতে প্রতুষ্যের কার্যক্রম দেখাতে নিয়ে যাবেন। যদিও প্রত্যুষের প্রাণপুরুষ অনিরুদ্ধ দা (অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী) রয়েছেন আমেরিকায় তার পুত্রের কাছে। তাতে কি প্রত্যুষের বন্ধুরাতো রয়েছে। দাদাকে নিয়ে বিস্তারিত অন্য লেখায় বলা যাবে। এখন আসি বারাসাত প্রসঙ্গে।
নীলদার সঙ্গে আরেকজন মানুষের নীরব অথচ সহাস্য উপস্থিতি খুবই স্মরণীয় এই ঢাকা সফরে। তা হচ্ছে অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী। পেশায় একজন সমাজবিজ্ঞানী হলেও মনের দিক থেকে আপাদমস্তক একজন কবি। এক অসাধারণ নরম হৃদয়ের মানুষ। সব ছাপিয়ে তিনি কাজ করেন সুবিধাবঞ্চিত নারী শিশুদের জন্য। সেই প্রত্যুষে যাচ্ছি ভেবে এবারের সফর সফল এটাই মনে হচ্ছিল। দাদা কথা ও কাজে একেবারে একই কাঁটায়। কাজেই পরদিন ৯টায় এসে দাদা হাজির। বারটি ছিল রোববার কাজেই কলকাতা শহর একটু ফাঁকা। আমি পুষ্পিতা আর শ্রয়ণ তৈরিই ছিলাম বারাসাত যাব বলে। কলকাতা শহর থেকে মাত্র তিরিশি কিলোমিটার যাত্রাপথ একঘণ্টাতেই পাড়ি দিলাম। গাড়িতে ওঠেই আমরা পেয়ে গেলাম বাংলাদেশের আরেকজনকে। তিনি বিক্রমপুরের মানুষ সোহেল মোল্লা। স্থানীয় নানান সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। ব্যবসায়ী। এখানে এসেছেন নীলদাকে নিয়ে বাংলাদেশে কিছু করতে চান এমন ইচ্ছায়। গাড়ি দিয়ে যেতে যেতে ওঠে আসে নানা প্রসঙ্গ। তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনীতির চিত্রও। একজনের অঙ্গুলি নির্দেশে চলছে কলকাতার সবকিছু। নানান কৌশলে লোক দেখানে উন্নয়নের নামে চলছে টাকার নয়ছয়। কেন্দ্রের চিত্রও একইরকম দাদা এমনটাই জানালেন।
কবি নীলাচার্যের কথায় জানতে পারি প্রত্যুষের জন্ম কথা। ১৯৯৯ সালে প্রত্যুষের যাত্রা শুরু। বাবা-মায়ের আদর্শ আর সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রেরণা নিয়ে সমাজ বিজ্ঞানী অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী ঝাঁপিয়ে পড়লেন সমাজ উপেক্ষিত পরিবারের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য কিছু করতে হবে। দেখা গেল ওদের পরিবারের সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে যে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, ধর্মান্ধতা, অজ্ঞতা রয়েছেতা দূর না করতে পারলে ওদের পরিবারের ছেলেমেয়েদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া এইসব ছেলেমেয়েদের সার্বিক উন্নতির জন্য গড়া হলো মানুষ হওয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা। এর মধ্যে- প্রথাগত ও প্রথা বহির্ভূত শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষার সার্বিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সাংস্কৃতিক বোধ গড়ে তোলা ও চর্চা, জীবনমুখী মনোরঞ্জনের স্বাদ এনে দেয়া, পুষ্টির ব্যবসা। তা করা, সামাজিক দায়দায়িত্ব পালনে অভ্যাস্ত করে তোলা, মায়েদের স্বাক্ষর ও আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে ওঠা, পারিবারিক সুস্থিরতা বজায় রাখতে বাবাদের উদ্যোগী করে তোলা। এছাড়া যৌথ উদ্যোগের সুফল, প্রত্যুষকে নিজেদের বন্ধু হিসেবে অনুভবে নিয়ে আসা, মেয়েদের বিয়ে, ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থানের জন্য সহায়তা, বাসস্থানের জরুরি ভিত্তিতে মেরামত ব্যবস্থা করা।
দেখতে দেখতে প্রত্যুষের চলে গেছে দেড়যুগ। এই ভাবনাতেই পৌঁছে যায় দোরগোড়ায়। টিপটিপ বৃষ্টিভেজা সকালে প্রত্যুষের একঝাঁক প্রাণোচ্ছ্বল কর্মী আমাদের স্বাগত জানাতে নিজেদের তৈরি ফুলের তোড়া নিয়ে হাজির। তারপর আবেগমাখা প্রত্যুষ পরিবারের শুভেচ্ছা কার্ড। লাল চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পৌঁছে যাই ছোট্ট হলরুমে। প্রত্যুষে নানান বয়সের বন্ধুরা হাজির। কথা আর গলে। ফাঁকে ফাঁকে জানতে পারি এদের অনেকেরই জন্মভিটে বাংলাদেশে। আমরা জানতে কৌতূহল দেশের জন্য তাদের মন কাঁদে কিনা। বরিশালের মেয়ে অন্তরা মুখার্জির বাবা-মা দুজনই বরিশালে শিক্ষকতা করতেন। এখন বাস তাদের বারাসাতে। তাদের অনেক আত্মীয়ও একযুগ আগেই নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে থিতু হয়েছেন এই বারাসাতেই। দুর অজানায় একরকম কষ্ট অনুভব করি অনেকের মধ্যে। তবু তারা বেড়ে ওঠছে ওখানের জল হাওয়ায়। স্বপ্ন দেখছে নতুনভাবে বাঁচার। প্রত্যুষের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানালো তাদের স্কুল অনেক শিক্ষার্থী আছেন যারা এই বাংলাদেশের। খেয়াল হলো আসার পথে দেখেছি লেখা রয়েছে টাকী রোড। আবার লেখা রয়েছে যশোহর রোড। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এই পথেই সোজা চলে গেছে বনগাঁ হয়ে যশোরের শার্শা। আর টাকী হচ্ছে সাতক্ষীরার ঠিক উল্টো পাড়ে। মনে পড়লো গৌতম ঘোষ আর হাবিবুর রহমান খানের যৌথ প্রযোজনার ছবি শঙ্খচিলে দেখেছি টাকী শহরের চিত্র।
উত্তর চব্বিশ পরগণার বারাসাতের পুরো ছবি যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। কলকাতা থেকে দেড় ঘণ্টার এই পথটুকু পেরিয়ে সেখানকার জনপদ যেন এক আপন বৃত্তে আঁকা। সেখানকার ভাষারীতিও যেন আমাদের সঙ্গে অনেকাংশেই মিল। প্রকৃতির কল্যাণে বাংলাদেশের মৃদুমন্দ ছন্দে বয়ে যাওয়া সমীরণ যেন কথা বলছে দুই বঙ্গেরই। অন্তরা মুখার্জিসহ অন্যদের কণ্ঠে গীত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর গান যা দেশভাগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর করেছিল অখণ্ড বাংলাকে। আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী...। তার রেশ না কাটতেই র‌্যাটকা খিচুড়ি আর বেগুন ভাজার অনন্য স্বাদে দুপুরের ভূরিভোজ। সময়ের তাড়া আমাদের তাগিদ দেয় ফেরার। মনের আকাশে তখন প্রত্যুষের জন্য কালো মেঘ। কোনো না কোনোভাবে প্রত্যুষের সঙ্গে থাকার প্রত্যয় নিয়ে পথচলা শুরু করি। ফেরার পথে মন পরে থাকে সেই মানুষগুলোর জন্য যারা সত্যিই এক অসাধারণ সামাজ গড়ার কাজে যুক্ত। প্রত্যুষের সভাপতি নিখিলেশ সেনগুপ্ত, সহসম্পাদক ইন্দ্র সরকার, দীপক চক্রবর্তী, সুজিত বিশ্বাস, অনু সরকার, রাসেদা আবেদীন, পার্থ গুপ্ত, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, অন্তরা মুখার্জি, শেখ মোমিন, শেখ সাত্তার, আবদুল কাইয়ুমসহ অনেক মা বোন যাদের ভোলার নয়। সবশেষে নিখিলেশ সেনগুপ্ত ও অন্তরা মুখার্জির পরিচালনায় নাচ, গান, কবিতা, নাটিকার মনমুগ্ধকর পরিবশেনা মনের গহীন কোণে বাজছে এখনও।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক আকরাম ৮ দিনের রিমান্ডে

টসে জিতে ফিল্ডিংয়ে রংপুর

বাড়ি ফিরেছেন নিখোঁজ ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায়

শিক্ষার্থীদের মাথা ন্যাড়ার শর্তে এসএসসি’র ফরম পূরণ!

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে

একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ

শিক্ষিকা-ছাত্রের যৌন সম্পর্ক, অতঃপর...

রাবি অপহৃত ছাত্রী ঢাকায় উদ্ধার

‘সমাবেশে জোর করে লোক আনা হয়েছে’

সমাবেশ মঞ্চে শেখ হাসিনা

যুদ্ধাপরাধের ২৯তম রায়ের আপেক্ষা

ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে চাঁদ দেখা কমিটির সভা কাল

সিরিয়া ইস্যুতে আবারো রাশিয়ার ভেটো

হারিরির সৌদি আরব ত্যাগ

ঢাকায় চীন-বাংলাদেশ বৈঠক শুরু

প্যারাডাইস পেপারসে শিল্পপতি মিন্টু ও তার পরিবারের নাম