কলকাতার কড়চা

ঢাকা-কলকাতার সিনেমা দর্শক

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, কলকাতা থেকে ফিরে | ২৬ আগস্ট ২০১৭, শনিবার
 কিছুদিন আগে ঢাকায় ঢি ঢি পড়ে গেল। উৎসাহীরা দলেবলে ছুটছে কলকাতায়। তাও যেনতেনভাবে নয়। খবর রটলো পুরো বিমান রিজার্ভ করে সিনেমা দেখার জন্য ছুটছে লোকজন। সময়ের আলোচিত ছবি বাহুবলী-২ দেখতেই এই দৌড়ঝাঁপ। এটা একটি ঘটনা। এমন আরও অনেকেই গেছেন। অনেকে ছোট ছোট গ্রুপে। আবার কেউ কেউ একাও ছবি দেখতে গেছেন। আর বাহুবলী-২ দেখে ফিরে আসা এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করতেই জানালো, ছবিটি দেখতে ঢাকা থেকে অনেকেই গেছেন। কিন্তু ছবি দেখার এই উন্মাদনা কেন? এ প্রশ্নটি অনেকদিন থেকেই মাথায় ঘুরছে? তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে চোখে পড়লো জনপ্রিয় অভিনেতা আফজাল হোসেনের একটি লেখা। যিনি কলকাতায় বাহুবলী-২ দেখে এসে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন পাঠকদের। অভিনেতা আফজাল হোসেন লিখেছেন, বাহু নয় চিন্তার বল দেখার আগ্রহ ছিল মনে। দেখে আসা হলো বাহুবলী। এই দেখে আসার ধরন খুবই বিশেষ। ছত্রিশজন একসঙ্গে ঢাকা থেকে কলকাতা উড়ে গিয়ে সিনেমা দেখা বিশেষই তো। আমাদের জীবনে এমন ঘটনা না ভোলার মতো, অত্যন্ত আনন্দের হয়ে থাকবে। বিষয়টা নিয়ে ভালো কথা, মন্দ কথা হতে পারে, ঠাট্টা-মষ্করা হতেও পারে। ভ্রূ-কোঁচকানো আলাপ-সালাপ- তা-ও হয়তো হবে। নিজের রুচি-অভিরুচি অনুযায়ী যে যেমন মন্তব্যই করুক, আমাদের মন্তব্য হচ্ছে সামর্থ্য থাকলেই মানুষ অনেক কিছু করে না বা করে উঠতে পারে না। আনন্দময় মনে হলেও সে আনন্দ অর্জনের তাগিদ বহু মনে থাকে না। সব মনে কৌতূহল থাকে, সে কৌতূহল টান মেরে এতজনকে একসঙ্গে এমন আনন্দে সামিল করায় না। মানুষের মনে ইচ্ছা জাগবে, সে ইচ্ছা পূরণের ইচ্ছা সব মনে বিশেষভাবে জেগে ওঠে না বলে ইচ্ছা অপূর্ণই রয়ে যায়। আমরা যেদিন বাহুবলী দেখতে গেলাম, হলে ঢোকার আগে দেখতে পাই শুধু আমরা নই তখন কলকাতায় থাকা অনেক বাংলাদেশি-ই আনন্দ উত্তেজনা নিয়ে সেখানে অপেক্ষমাণ। কারও কারও সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে। আমরা এতজন একসঙ্গে সিনেমা দেখতে এসেছি শুনে তারাও অবাক না হয়ে পারেনি। অবাক করলেও ঘটনা কি অতটা অবাক করানোর মতো? পরিচয় হওয়া পাঁচজনের একটা পরিবার সে রাতে বাহুবলী দেখতে গিয়েছে। পরিচয়ের পর জানা হলো, কলকাতায় আসবার পরিকল্পনা আগেই ছিল, ছেলে মেয়েদের আগ্রহে বাহুবলীর মুক্তির সঙ্গে আসা ও থাকার দিন মেলানো হয়েছে। সে মতোই রথ দেখা ও কলা বেচা একসঙ্গে হয়ে যাচ্ছে। ছত্রিশজন তাহলে অনেক নয়। আমরা গিয়েছি অনেক পরিবার একসঙ্গে, কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু একত্রে। আলাদা আলাদাভাবে সবারই কলকাতা এসে রথ দেখা ও কলা বেচা হয়, হয়েছে বহুবার। এবারই প্রথম সবাই মিলে আসা হয়েছে শুধুই রথ দেখতে। তথ্য মিলেছে বাংলাদেশ থেকে এমন অনেক সিনেমাপ্রেমী ছুটে যান কলকাতায়। সিনেমা দেখে আবার ফিরে আসেন। এ ঘটনা এখন নিয়মিত। এবারের ভ্রমণে আমি হলমুখী না হলেও এর আগেরবার বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান আর দীপিকা পাডুকোন অভিনীত ছবি চেন্নাই এক্সপ্রেস দেখেছিলাম। ছবিটির টিকিট পেতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। তবে বড় পর্দায় এই ছবিটি দেখার যে আনন্দ তা কোনোভাবেই ইউটিউব বা ছোট পর্দায় ডিভিডিতে দেখে মজা পাইনি। আর একটা বিষয় লক্ষণীয় যে কলকাতায় দর্শকরা ছুটছে হলের দিকে। আর সেখানকার ছবি দেখার পরিবেশ সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। এখন বড় বড় শপিং কমপ্লেক্সে রয়েছে সিনেপ্লেক্স। যেখানে একই সঙ্গে রয়েছে একাধিক সিনেপ্লেক্স। আর এর পাশেই রয়েছে বাহারি ফুড সেন্টার। আপনি চাইলেই আপনার খাবার চলে আসবে সিটেই। আর ছবি দেখার জন্য দর্শকদের সুবিধার্র্থে করা হয়েছে নানান ডিজিটাল পদ্ধতি। সিনেপ্লেক্সগুলোর রয়েছে পৃথক অ্যাপস। আপনি কোন একটি অ্যাপস আপনার মোবাইলে ডাউনলোড করলেই মুহূর্তের আপডেট জানতে পারবেন। কোন সময় কোন ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে। আর সামনের দিনে কী কী আসছে। তাছাড়া রয়েছে কল সেন্টারও। ছবি দেখার আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে ব্যবহার হচ্ছে কায়দা-কৌশলও। যেমন নতুন ছবি এলেই নায়ক-নায়িকারা দর্শকদের অবাক করে দিতে হলে প্রবেশ করেন। তারপর একটি সিনেপ্লেক্সে কখনও একই ছবি পরপর প্রদর্শিত হয় না। আপনি সকালে যে শো দেখলেন পরে তা বদলে অন্য কোন ছবি আসবে। একই ছাদের নিচে যদি একাধিক সিনেপ্লেক্স থাকে তাহলে একেকটিতে একেক সময় একেক ধরনের ছবি প্রদর্শিত হবে। এতে দর্শক তার পছন্দ মতো ছবি দেখতে পাবে। আর কোনো রকম বিরক্তির উদ্রেক হবে না। আর নিরাপত্তা নিয়ে নেই কোনো ভাবনা। আমাদের এখানে কটি সিনেপ্লেক্স ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবার নিয়ে ছবি দেখার কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রবেশ আর বাহির লেখা পথে যে ধরনের ধাক্কাধাক্কি হয় আমাদের এখানে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের হল বিমুখ করে। কিন্তু কলকাতায় বড় শপিং মলগুলোতে যে ধরনের মাল্টিপ্লেক্স চালু হয়েছে তাতে এগুলো ভাবনারও বাইরে। যখন আমাদের এখানে বিতর্ক চলছে যৌথ সিনেমা নিয়ে, তখন কলকাতায় আমাদের ছবিও দেদারসে চলছে। রাস্তায় চলার পথে নবাব বা বস-২ ছবির পোস্টারও চোখে পড়েছে। যদিও সেখানের হলগুলোতে সর্বভারতের চার পাঁচটি ভাষায় করা ছবির বাইরে হলিউড ছবির দর্শক রয়েছে। কাজেই বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে একাধিক ধরনের ছবি দর্শকদের হলমুখী করতে অনেক বেশি সহায়ক। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক পাগল দর্শককে বলতে শুনেছি। তিনি সময় পেলেই ছুটে আসেন কলকাতায় ছবি দেখতে। তার একবারের ছবি দেখার শিডিউল শুনে আমার জিভ আটকে গেছে। সকালে মর্নিং শোতে ঢুকেছেন বাজিরাও মাস্তানি দেখতে। তারপর দেখেছেন ইয়ার লিফট। এরপর ওয়াজিব আর পিঙ্ক। সেদিনের মতো ফিরে গিয়ে পরদিন ফের জুলফিকার আর এম এস ধোনি দেখে সেবারের মতো সাঙ্গ করেছেন ছবি দেখার পর্ব। যতবারই তিনি গেছেন কলকাতায় একের পর এক ছবি দেখতেই থাকেন। আর সিনেপ্লেক্সে বাহারি পদের খাওয়া-দাওয়ার কমতি নেই। পছন্দসই খাবার চাইলে হলে বসেই তা পান। এমন সুখের বিনোদন কতটুকুই পাবেন অন্য কোথাও। যদিও সিনেমা হল বন্ধের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই কলকাতাও। ঢাকাতে যে হারে হল কমছে সে তুলনায় কলকাতাও পিছিয়ে নেই। এক সময়ের ধর্মতলার মেট্রো, চ্যাপলিন, সোসাইটি হারিয়ে গিয়েছে। লাইটহাউস এখন কাপড়ের বাজার। নিউ মার্কেট এলাকায় কোনো রকমে গ্লোব টিকে রয়েছে। অথচ এখন দক্ষিণ থেকে উত্তর মাল্টিপ্লেক্সের উপস্থিতি অনেক। সেখানে চুটিয়ে চলছে সিনেমা। বেশ চড়া দাম দিয়ে মাল্টিপ্লেক্সেও আরামে সিনেমা থেকেই মানুষ ছুটছেন বলেই জানতে পেরেছি। মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে যে ধরনের আয়োজন রাখছে তাতে সকালের প্রথম শো থেকে শুরু মধ্যরাতে কাজের শেষে ছবি দেখে সেখানকার দর্শকরা বাড়ি ফিরছে। এটাই হচ্ছে ঢাকার দর্শক আর কলকাতার দর্শকদের মধ্যে বিরাট ফারাক। যদিও কলকাতার বাইরের সিঙ্গেল স্ক্রিন হলগুলোর চিত্র এখন বদলাচ্ছে। দর্শকদের হলমুখি করতে তাদের নেয়া বেশকিছু ব্যবস্থা নিয়ে এরমধ্যেই বিতর্ক চলছে। এর একটি হচ্ছে ‘নিভৃত বক্স’ ব্যবস্থা। যুবক-যুবতীদের হলে টানতে একধরণের কাঠের দেয়াল করে বক্স পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে হল কতৃপক্ষ। এতে করে একান্তে কিছু সময়ের জন্য জোড়ায় জোড়ায় ছেলে-মেয়েরা হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এ ব্যবস্থায় বেশকিছু অঘটনও ঘটেছে। ফলে বাবা-মায়েরা তাদের ছেলে-মেয়েদের এ ধরণের হলে ছবি দেখায় দিনদিন কঠোর হচ্ছে। আর এতে করে শহরের বাইরের হলগুলোতে দর্শক কমছে।
কলকাতার কয়েকটি জনপ্রিয় মাল্টিপ্লেক্স: কলকাতার মাল্টিপ্লেক্সগুলো শহরের তরুণ-তরুণীদের খুব পছন্দের। নানা সুবিধা রয়েছে ছবি দেখার। কলকাতার সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হলগুলো অধিকাংশই গুটিয়ে গেছে। বাকিগুলোও গোটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এই সুযোগে মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে চলছে রমরমা ব্যবসা। কলকাতায় আইনক্সই প্রথম চালু করেছিল মাল্টিপ্লেক্স সেনেমা দেখার সুযোগ। সাউথ সিটি মলে আইনক্সের মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখতে ভিড় লেগেই থাকে। একে সময়ের শোয়ের টিকিটের দামও আলাদা। এই আইনক্স কলকাতার নানা প্রান্তের শপিংমলগুলোতে একাধিক মাল্টিপ্লেক্স চালু করেছে। সল্টলেকের সিটি সেন্টার-১ এবং ২ এবং  কলকাতার বর্তমানে আলোচিত অভিজাত শপিং মল কোয়েস্টেও রয়েছে আইনক্স। আইনক্সের পাশাপাশি পিভিআর এবং সিনেপোলিসও একাধিক মাল্টিপ্লেক্স চালু করেছে কলকাতার নানা প্রান্তের শপিংমলে। কলকাতার এক দর্শক অ্যাক্রোপলিস মলের সামনে দাঁড়িয়ে শোনালো সিনেপোলিসে ছবি দেখার অভিজ্ঞতা। সে জানাল, টিকিট কাটার কোনো ঝামেলা নেই। যে ছবি দেখতে চাই তারই টিকিট পাওয়া যায়। নিজের পছন্দ মতো আসন বাছাই করার সুযোগও রয়েছে। আর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা। এই সুযোগ সিঙ্গল স্ক্রিনের পুরাতন হলগুলোতে পাওয়া সম্ভব নয়। সর্বোপরি আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন সিনেমা প্রদর্শন ব্যবস্থা সকলকে খুশিই করে। অর্থাৎ কলকাতার তরুণ প্রজন্ম এখন মজে রয়েছে মাল্টিপ্লেক্সে।

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

‘প্রধানমন্ত্রীর উপর হামলা চেষ্টার খবর ভিত্তিহীন’

‘প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চক্রান্তের খবর সম্পূর্ণ ভূয়া’

‘জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চক্রান্ত’

বান্দরবানের রোহিঙ্গারা কোন মনোযোগই পাচ্ছেন না

টেকনাফে চার লাখ ৯৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুই রোহিঙ্গা আটক

যুবলীগ নেতাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ

ধুমপানে বাধা দেয়ায় দোকানিকে সিগারেটের ছ্যাঁকা

পারমাণবিক যুদ্ধের হিম আতঙ্ক

লেবার নেতা হিসেবে সাদিক খানকে দেখতে চান বৃটিশ ভোটাররা

রোহিঙ্গাদের সমর্থনে বোস্টনে প্রতিবাদ বিক্ষোভ

কর্ণফুলীতে বিএনপির তিন প্রার্থীর নির্বাচন বর্জন

মনিপুর থেকে ১০৭ ‘বাংলাদেশী’ পুশব্যাক

পূর্ব লন্ডনে এসিড হামলায় আহত ৬

সাদুল্যাপুরে ১১২ মেট্রিক টন চাল জব্দ, গুদাম সিলগালা

রোহিঙ্গা ইস্যুতে এবার বিমসটেকেও ছায়া পড়েছে

রাজধানীতে আগুনে পুড়ে নিহত ১