বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক কেলেঙ্কারি, কঠোর অবস্থানে ইউজিসি

এক্সক্লুসিভ

নূর মোহাম্মদ | ২৭ আগস্ট ২০১৭, রবিবার
 নানা কৌশলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে ট্রাস্টি বোর্ড (বিওটি) সদস্যরা। ‘নো লস, নো প্রফিট’ ধারণা নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলার কথা থাকলেও অধিকাংশই এখন লাভজনক ব্যবসা। বিওটির সদস্যদের আর্থিক অনিয়ম ঠেকাতে এবার কঠোর অবস্থানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সংস্থাটি গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে আগামী ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের নির্ধারিত সিএ ফার্ম দিয়ে অডিট রিপোর্ট করে জমা দিতে বলছে। না হয়, তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি বাতিল, অভিযুক্ত ব্যক্তির কারাদণ্ড বা অর্থ জরিমানা বা উভয় দণ্ডে শাস্তি দেয়া হবে। এ ব্যাপারে ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান মানবজমিনকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার আইনে পরিষ্কার বলা আছে প্রতি বছর অডিট রিপোর্ট জমা দিতে হবে। কিন্তু কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় সেটা শুরু থেকেই অনুসরণ করছে না। অডিট করালেও তাদের পছন্দের সিএ ফার্ম দিয়ে অডিট করিয়ে প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে। এটা মোটেও কাম্য নয়। এ ধরনের ব্যত্যয় ঠেকাতে আমরা পরিষ্কার করে বলে দিয়েছি, সরকারের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান দিয়েই অডিট করাতে হবে। এবার যারা ব্যর্থ হবে তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেয়া হবে।  
ইউজিসি’র একাধিক সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিওটি সদস্য বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোন আর্থিক সুবিধা নিতে পারবেন না। আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করাতে হবে। এ প্রতিবেদন পরবর্তী আর্থিক বছরের ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে। এ ধারার নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ বাতিলের নির্দেশনা আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের বলা আছে যারা অডিট রিপোর্ট দিবে না তাদের বিরুদ্ধে ৪৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। আইনের ১৪, ২৫ ও ২৬ ধারা অনুযায়ী অর্থ কমিটি গঠন ও পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্থ কমিটির কোনো সভা করে না। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ করেনি। আবার যেখানে কোষাধ্যক্ষ আছে, সেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের পছন্দের লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এভাবে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা অর্থ আত্মসাৎ করছে বিওটি’র সদস্যরা।
কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন নিয়মিত ইউজিসিতে জমা দিচ্ছে না। ইউজিসি’র সামপ্রতিক প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো  নিরীক্ষা সরকারি উদ্যোগে হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সরকারের তালিকাভুক্ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের (সিএ ফার্ম) মাধ্যমে নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন ইউজিসিতে জমা দেয়ার কথা। কিন্তু ইউজিসি’র সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা ৮৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন হালনাগাদ রয়েছে মাত্র ৮টির। এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে গেল সপ্তাহে এক গণবিজ্ঞপ্তিতে শেষ আল্টিমেটাম দিয়েছে ইউজিসি। সেখানে বলা হয়, সরকারের তালিকাভুক্ত সিএ ফার্ম দ্বারা এই অডিট করিয়ে আগামী ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রণালয় ও ইউজিসিতে জমা দিতে হবে। আর সেই অডিট নির্ধারিত পদ্ধতির ও ফার্মের মধ্যে থেকেই করতে হবে। অন্য কোনো উপায়ে এই অডিট প্রতিবেদন জমা দিলে তা গ্রহণ করবে না ইউজিসি।
বেসরকারি শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিওটির সদস্যরা অনিয়ম ও দুর্নীতি আাড়াল করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক আয় ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা (অডিট) জমা দিচ্ছেন না। এমনকি প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অডিট রিপোর্ট জমা দেয়নি। মাত্র ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের হালনাগাদ তথ্য রয়েছে। বাকিগুলোর অডিট রিপোর্ট অনিয়মিত।
অভিযোগ রয়েছে, আইনের তোয়াক্কা না করে বিওটি সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ভুয়া কাগজপত্র ও স্বাক্ষর জাল করে সংরক্ষিত তহবিলের (ফান্ড) বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আট ক্যাটিগরিতে মোট ১২ জন সিন্ডিকেট সদস্য রয়েছেন। মিটিংয়ে উপস্থিত থাকার জন্য একজন সিন্ডিকেট সদস্য মিটিংয় প্রতি সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত সম্মানী নিচ্ছেন। প্রমোদ ভ্রমণের জন্য অনেক সময় বিদেশেও সিন্ডিকেট মিটিংয়ের আয়োজন করা হয়। এভাবে বিভিন্ন বৈঠকের নামে বিওটির সদস্যরা বছরে সম্মানীর নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। কেনাকাটায়ও চলছে অনিয়ম, দুর্নীতি।  নানা কৌশলে কোটি কোটি টাকা লুটপাট চলছে। ইউজিসি’র তদন্ত রিপোর্টেও এসব তথ্য উঠে এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে হস্তান্তর করা প্রতিবদেনে এ ধরনের অভিযোগের কথা বলেছে ইউজিসি। এতে সনদ বিক্রি, সিন্ডিকেটের নামে অর্থ আত্মসাৎ, গবেষণাখাতসহ ১৬ ধরনের  আর্থিক দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ইউজিসি’র বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৯৫টি। এর মধ্যে গত বছর দেশের ৮৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আয় ছিল প্রায় দুই হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। গড়ে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় আয় করেছে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা। অপরদিকে গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যয়ও করেছে প্রায় দুই হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। আয়-ব্যয় সমান দেখিয়েছে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়। আয়-ব্যয় কীভাবে সমান হয় তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে ইউজিসি’র।
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন