সংসদে ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের সমালোচনা

প্রথম পাতা

সংসদ রিপোর্টার | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৫৬
ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে সংবিধান সংশোধনী আল্ট্রা ভাইরাস ঘোষণাকে বাতিল ও প্রধান বিচারপতি জাতীয় সংসদ সম্পর্কে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যে ‘অসাংবিধানিক’, ‘আপত্তিকর’ ও ‘অপ্রাসঙ্গিক’ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে তা বাতিল করতে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় সংসদ। গতকাল স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে সরকারবিরোধী দল ও স্বতন্ত্র এমপিদের আলোচনা শেষে ওই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আলোচনায় এমপিরা প্রধান বিচারপতির পাশাপাশি এমিকাস কিউরিদের কঠোর সমালোচনা করেন। এমপিরা রায় প্রত্যাহারসহ বিষয়টি নিয়ে রিভিউ করার পরামর্শ দেন। এর আগে বিষয়টি নিয়ে নোটিশের মাধ্যমে প্রস্তাব উত্থাপন করেন জাসদের এমপি মঈন উদ্দীন খান বাদল। প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি বলেন, সংসদের অভিমত এই যে সংবিধান ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে সংবিধান সংশোধনী আল্ট্রা ভাইরাস ঘোষণাকে বাতিল করার জন্য ও প্রধান বিচারপতি কর্তৃক জাতীয় সংসদ সম্পর্কে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যে অসাংবিধানিক, আপত্তিকর ও অপ্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে তা বাতিল করার জন্য যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, পানি সম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, মুহাম্মদ ফারুক খান, জাতীয় পার্টি এমপি ফখরুল ইমাম, সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, ফজিলাতুন নেসা বাপ্পী প্রমুখ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিষয়টি জাতীয় সংসদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদকে যদি কেউ ছোট করার চেষ্টা করে তাহলে সমগ্র জাতিকে ছোট করা হয়। আমাদের সংবিধানে আছে জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। এই সংসদ নিয়ে যদি কোনো বিরূপ মন্তব্য করা হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা কষ্ট পাই, দুঃখিত হই। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন। এর আগে আদালতের বন্ধু বা এমিকাস কিউরিদের বক্তব্য নিয়েছেন। সেখানে বক্তব্য রাখেন ড. কামাল হোসেন যিনি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ বিরোধী, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম আওয়ামী লীগ বিরোধী, রোকনউদ্দিন মাহমুদ একেক জায়গায় একেক কথা বলেন, হাসান আরিফ বিএনপির আমলে এটর্নি জেনারেল, ফিদা কামাল ওয়ান ইলেভেন সরকারের এটর্নি জেনারেল, টিএইচ খান জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী। এসব লোকদের দিয়ে বক্তব্য দিয়ে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, পৃথিবীর বড় বড় দেশের কোথাও এ পদ্ধতি নেই। সেখানে সংসদীয় ভোটাভুটির মাধ্যমে বিচারপতিদের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়। তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আলটিমেটলি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির হাতেই আসবে।  প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন। তাই ওই ক্ষমতা তিনি নিজের হাতে রাখেননি। প্রধান বিচারপতির প্রতি আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। তাকে বলি, বেশি কথা বলা ভালো না। প্রধান বিচারপতি বলেছেন, আমাকে মিসকোট করা হয়েছে। মিসকোট কাকে করা হয়? যিনি বেশি কথা বলেন। অতীতে কোনো বিচারপতি এত বেশি কথা বলেননি। প্রধান বিচারপতি আমাদের পার্লামেন্টকে অপরিপক্ব বলেছেন। এই সংসদে অনেকেই আছেন, গণপরিষদের সদস্য ছিলাম। আমরা যখন সংবিধান তৈরি করি সেখানে আমাদের স্বাক্ষর রয়েছে। সে সময় অনেক বিচারপতি ছিলেন স্কুলের ছাত্র। আজ তারা দাবি করছেন তারা পরিপক্ব আর আমরা অপরিপক্ব। সবার দুর্নীতির তদন্ত করা যাবে কিন্তু বিচারপতিদের দুর্নীতি তদন্ত করা যাবে না। কি বিস্ময়কর বক্তব্য! তিনি বলেন, আমি আইনমন্ত্রীকে বলবো ষোড়শ সংশোধনী রায় নিয়ে রিভিউ করুন। বিএনপি রায় না পড়ে লাফালাফি করেছিল। কিন্তু রায়ে তাদের বলা হয়েছে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী। এই রায় দিয়ে আসলে বিএনপিকে উৎফুল্ল করার চেষ্টা হয়েছিল।
প্রস্তাব উত্থাপন শেষে বক্তব্যে মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, ষোড়শ সংশোধনী রায়ে, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার পর্যবেক্ষণের অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে অপ্রয়োজনীয়, অবাঞ্ছিত বক্তব্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের অপরিপক্ব আখ্যায়িত করেছেন। এ বিষয়টি নিয়ে এমনভাবে আলোচনা, গুঞ্জন চলছে যা সমগ্র জাতির জন্য বাঞ্ছনীয় নয়। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চাদর সৃষ্টি হয়েছে সংসদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের সমন্বয়ে যাতে সংবাদপত্র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানে ৭(১) এ পরিষ্কারভাবে বলা আছে- ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ তিনি বলেন, জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি রূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য হয় তাহলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হইবে। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি অনেকেই যখন ব্যক্তির ও সংগঠনের জন্য নির্ধারিত লঙ্ঘনরেখা অতিক্রম করেন তখন সমাজ ও রাষ্ট্রে সংকট অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। এই সংসদ ব্যাপক আলোচনার নিরিখে বর্তমান অবস্থার অবসান চায়। যাতে করে অশুভ গণবিরোধী শক্তির ঘোলাজলে মাছ শিকারের প্রচেষ্টা গুঁড়িয়ে যায়। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির বক্তব্য শুনলে মনে হয়, অস্ত্রধারী উত্তরপাড়ায় একমাত্র উত্তম। পরিপক্ব প্রধান বিচারপতির বোঝা উচিত এই সংসদ তার সীমারেখা অতিক্রম করে না। মার্শাল ল’র গর্ভে জন্ম নিয়ে আপনারা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নিজেদের কাছে রাখতে চান। তিনি বলেন, অহেতুক এই বিষয়টি বাংলাদেশে মুখরোচক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দেশকে এগিয়ে নিতে এই সংসদ একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলে মনে করি।
জাতীয় পার্টির এমপি ও শ্রম এবং কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হক চুন্নু বলেন, আইনমন্ত্রীকে বলবো রায় নিয়ে রিভিউ করার। ২০১২ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের পর বাংলাদেশে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বলে আর কিছু নেই মনে করি। এ কাউন্সিল নিয়ে তো আর রিভিউ হতে পারে না। আপিলেট ডিভিশনেই এটা চূড়ান্ত হয়ে গেছে। এটা করতে হলে আবার নতুন আইন করতে হবে। বাংলাদেশে অরজিনাল জুডিরিয়াকশন কোনো সুপ্রিম কোর্ট নেই। এজন্য তারা এ নিয়ে কোনো রায় দিতে পারে না। তিনি বলেন, অতীতে বেশ কয়েকজন বিচারকের রায়ে বলা হয়েছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তারা কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেননি। তাহলে এটা নিয়ে কেন আবার এত কথা বলা হচ্ছে।
স্বতন্ত্র এমপি রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, বিষয়টি খুব স্পর্শকাতর। আইনি বিষয়। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করা হয়েছে। এটা একটি উদাহরণ। আমাদের আইন পরিষদের কাজ আইন তৈরি করা। আর বিচারপতিদের কাজ বিচার করা। কিভাবে তারা বিচার করবেন এজন্য চার প্রক্রিয়া রয়েছে। এজন্য তাদের আমাদের সংবিধান বুঝতে হবে, পড়তে হবে। আমাদের সংবিধান সংকীর্ণ নয়। এর ব্যাপকতা রয়েছে অনেক। তিনি বলেন, রায়ের পর্যবেক্ষণে অনেক কথা এসেছে। যেগুলো অবান্তর। রাজনীতিতে একটি নতুন অশনি সংকেত আনার জন্য পর্যবেক্ষণে এসব কথা বলেছেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী বলেন, এই রায় পূর্ব পরিকল্পিত এবং জনবিরোধী। প্রধান বিচারপতি বাঙালিদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছেন। আপনার অস্বাভাবিক ব্যাংক লেনদেনের কারণ কি। যারা এক সময় বলেছিল বাংলাদেশের এই সংবিধান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংবিধান। হঠাৎ কি এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো যে এখন তারা আবার বলছেন, এই সংবিধান ভালো নয়। কেন এই মিথ্যাচার। আইনমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো এই রায় বাতিল করতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন।
তাহজীব আলম সিদ্দিকী বলেন, রায়ের পর্যবেক্ষণে যেসব কথা বলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক, অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। কোনোভাবেই যেন এর ব্যত্যয় না ঘটে। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে চিফ জাস্টিস সাহেব নির্বাচন প্রক্রিয়া, সংসদীয় চর্চা, রীতিনীতি ও কার্যক্রম নিয়ে আপত্তিকর এবং নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। এমপিদের পরিপক্বতা ও সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা নিয়েও তিনি মন্তব্য করেছেন এবং অবিবেচকের মতো দেখিয়েছেন, সংসদের হাতে বিচারকদের অভিশংসন ক্ষমতা দেয়া আত্মঘাতী হবে। তিনি বলেন, ২০০৬ সালে যখন সেনাশাসিত সরকার আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশ পরিচালনা করেছিল এবং ক্যাঙ্গারু কোর্ট বানিয়ে রাজনীতিবিদদের বিচারের নামে বি-রাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া চালু করেছিল। আমার প্রশ্ন, সিনহা সাহেব তখন কি অবকাশে গিয়েছিলেন?  নাকি তার চৈতন্যের বিনাশ ঘটেছিল? সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, রায়টিতে অসঙ্গতি রয়েছে। বিচারপতি বলেছেন বেসিক স্ট্রাকচারের কথা। আমাদের সংবিধানে এসব নিয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। আমি আইনমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো রায় নিয়ে রিভিউ করুন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, একটি অসাংবিধানিক সরকারকে ক্ষমতায় আনার চক্রান্তের অংশ হিসেবে তিনি এ রায় দিয়েছেন। বিষয়টি আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে তিনি কলঙ্কিত করেছেন। তার কারণে আজ অনেক বিচারপতি মুখ দেখাতে পারছেন না।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Suhel

২০১৭-০৯-১৪ ০৭:২৪:২৫

"বিএনপি রায় না পড়ে লাফালাফি করেছিল। কিন্তু রায়ে তাদের বলা হয়েছে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী। এই রায় দিয়ে আসলে বিএনপিকে উৎফুল্ল করার চেষ্টা হয়েছিল।" এ কথার প্রকৃত অর্থ টা কি দাঁড়ালো বুঝলাম না।

আপনার মতামত দিন

নিহত জঙ্গি আব্দুল্লাহ’র স্ত্রী গ্রেপ্তার

নিহত কিশোরের লাশ উদ্ধার

জেএমবির তিন সদস্যের ১৪ বছর কারাদণ্ড

শচীন যা পরেননি পৃথ্বি তা-ই পারলেন

টেকনাফে ৫ কোটি ৭০লক্ষ টাকার ইয়াবা উদ্ধার

‘নিজ অবস্থান থেকে আইন মানলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে’

চাল আমদানি করছেন না ব্যবসায়ীরা

তারেকের গ্রেপ্তার সংক্রান্ত প্রতিবেদন ৩১শে ডিসেম্বর

প্লেবয় মডেল হারতে’র ‘মজা’

আদালতে হাজিরা দিলেন নওয়াজ শরীফ

ইরাকে আগ্রাসনের হুমকি এরদোগানের

এতিম রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হচ্ছে

মাঝারী ধরনের ভারী বর্ষণের আশঙ্কা

মিয়ানমার ইস্যুতে বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক

বিস্ময়কর উত্থান ঘটলেও জার্মানিতে এএফডি’র নেতা কে!

‘এখন শুধুমাত্র ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবছি’