সুন্দরবনের শুঁটকি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা

এক্সক্লুসিভ

আবু সাইদ শুনু, বাগেরহাট থেকে | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, সোমবার
 আসন্ন শুঁটকি মৌসুমকে ঘিরে সুন্দরবনের দুবলা চরাঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণ নিতে ক্ষমতার দাপটের লড়াইয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবন সাব-সেক্টর কমান্ডার ও দুবলার ফিশারম্যান গ্রুপের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের মৃত্যুর পর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে শুরু হয়েছে পেশি শক্তি ও ক্ষমতার লড়াই। স্বাধীনতাবিরোধী একটি প্রভাবশালী চক্র সাগর পাড়ের বিশাল শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে নানা অপতৎপরতা শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে মৌসুম শুরুর আগেই জেলে ও শুঁটকি ব্যবসায়ীদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আর এ কারণে দুবলার জেলে ও শুঁটকি ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানা শঙ্কা বেড়েই চলছে। দুবলার জেলে ও শুঁটকি ব্যবসায়ীরা জানান, সুন্দরবনের রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত হচ্ছে দুবলার শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ চরাঞ্চল।
এখানে প্রতি বছর মৌসুমে কোটি কোটি টাকা মূল্যের শুঁটকি উৎপাদিত হয়ে থাকে। প্রতি অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ৫ মাস জেলে ও ব্যবসায়ীসহ হাজারো পেশাজীবী মানুষের সমগম ঘটে থাকে দুবলায়। অন্তত ৩০ হাজার জেলে ও মৎস্যজীবীর জীবিকা নির্বাহ হয়ে থাকে সাগরে মাছ আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণকে ঘিরে। দুবলার চরের মৎস্যজীবীরা জানান, মেজর জিয়াউদ্দিন দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে গত প্রায় ৩৪-৩৫ বছর ধরে দুবলার চরসহ সুন্দরবন উপকূলে শীতকালে শুঁটকি মাছ আহরণসহ বছরব্যাপী বঙ্গোপসাগরে সুন্দরবন উপকূলের মাছ ব্যবসার প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী ছিলেন। এ ব্যবসায় মরহুম জিয়ার পাটর্নার ও সহযোগী ছিলেন তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন, ভাগ্নে শাহনুর রহমান শামীম প্রমুখ। এছাড়া কক্সবাজার এলাকার জগন্নাথ বহরদার, সাবের বহরদার, অনীল বহরদার, খুলনার মাসুম চৌধুরী, মোংলার বুলবুল ইজারাদার প্রমুখ। দুবলার চরে দীর্ঘ কয়েক বছর মৎস্য ব্যবসা করেন এমন কয়েকজন প্রবীণ মৎস্যজীবী জানান, ১৯৮২ সালের দিকে মেজর জিয়ার পাশাপাশি খুলনার খান সফিউল্লাহ খোকন নামের এক ব্যক্তি সুন্দরবনে দুবলার চরে চিংড়ি ব্যবসা ও আস্তে আস্তে মাছের ব্যবসা এবং শুঁটকি মাছ পরিবহনের ব্যবসা শুরু করে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে অন্য এক প্রভাবশালী মাছ ব্যবসায়ীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের দু’জনের প্রভাব ও সুন্দরবনে অবস্থানকারী বিভিন্ন প্রশাসনের সহায়তায় আলোরকোল চরের সকল মাছের ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে নেন খোকন। একপর্যায়ে খোকন দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের অন্যতম কর্মকর্তা হিসেবে নিজের প্রতিপত্তি ও প্রভাব সংহত করেন। সুন্দরবন উপকূলের ডুমরিয়া, বটিয়াঘাটা, কয়রা, দাকোপ, রামপাল প্রভৃতি এলাকায় ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যবসায়ী ও জেলেরা খোকনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে কেউ কেউ সুন্দরবনের সাগরে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত হয়েছেন। কয়েকজন জেলে মহাজন অভিযোগ করে বলেন, দাদন ব্যবসা, বন বিভাগের রাজস্ব ফাঁকি, ছোট মাছ ব্যবসায়ীদের ভাগের টাকা মেরে দেয়া, অবৈধ পথে এই ব্যক্তি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এই অর্থ পুঁজি হিসেবে খাটিয়ে দুবলার চরের মৎস্য ব্যবসায়ও তিনি তার অবস্থান শক্তিশালী করেন। মেজর জিয়ার জীবিত অবস্থায় দুবলার চরসহ সুুন্দরবনে সফিউল্লাহ খোকন কখনই প্রকাশ্যে দাপট বা দৌরাত্ম্য না দেখালেও তার মৃত্যুর পর খান সফিউল্লাহ খোকন সেখানে নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করার সকল বন্দোবস্ত করে ফেলেছেন। ইতিমধ্যে মরহুম মেজর জিয়ার ঘনিষ্ঠ ও আত্মীয়স্বজনকে দুবলার চর থেকে উৎখাত করার চক্রান্ত শুরু করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি খুলনা ও সাতক্ষীরা এলাকার দুর্ধর্ষ ক্যাডারদের সুন্দরবন ব্যবসায় নিয়োজিত করার চক্রান্ত করেছেন। সুন্দরবনে মেজর জিয়ার অবর্তমানে সফিউল্লাহ খোকনের এ অপতৎপরতার কারণে দুর্গম চরাঞ্চলটি অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন দুবলার জেলে ও শুটকী ব্যবসায়ীরা। এবিষয়ে খান সফিউল্লাহ খোকন মুঠোফোনে সাংবাদিকদের জানান, দুবলার চরে মৎস্য ব্যবসার পরিপ্রেক্ষিতে তার নানা প্রতিপক্ষ রয়েছে। তিনি তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসবই ব্যবসায়িক চক্রান্ত। তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য মিথ্যা অপবাদ দেয়া হচ্ছে। তিনি কোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কখনও জড়িত ছিলেন না এবং এখনও নেই। মোংলার মৎস্য ব্যবসায়ী শাজাহান খান, আবুল বাশার, আলম শেখ ও রামপালের মৎস্য ব্যবসায়ী দিপক সরকার, অচিন্ত মন্ডল, জালাল উদ্দিন, চুন্নু মিয়াসহ অনেক ব্যবসায়ী আশংকা করেছেন মেজর জিয়ার মৃত্যুর পর দুবলার চরের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে তারা এবারের মৌসুমে মৎস্যজীবীরা যাতে সুষ্ঠুভাবে মাছ আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়া করতে পারে তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি জানান। প্রায়ত মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের ছোট ভাই ও দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের নেতা মুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন জানান, আসন্ন শুঁটকি মৌসুমের সমুদ্র যাত্রার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন জেলেরা। তবে দুবলার চরাঞ্চলে যাতে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা কিংবা অপশক্তির আগ্রাসন জেলেরা মেনে নেবেন না। তিনি আরও বলেন, আসন্ন মৌসুম নিয়ে ব্যবসায়ীদের একটি মহল অপতৎপরতা চালাচ্ছে। পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, এবারের শুঁটকি মৌসুমে যাতে কোনো ধরনের অরাজকতা অথবা সংঘাত সৃষ্টি না হয় সে জন্য বন বিভাগের পাশাপাশি বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সজাগ দৃষ্টি রাখছে। মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের অপারেশন কর্মকর্তা লে. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, শুঁটকি মৌসুমে যাতে কোনো সংঘাত ছাড়াই মৎস্যজীবীরা সুষ্ঠুভাবে মাছ আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়া করতে পারে সে জন্য কোস্টগার্ড সদস্যরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। সেখানে কোনো অবস্থাতেই অপশক্তিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না।


 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

মৌলভীবাজারে শোকের মাতম

বিয়ানীবাজারের খালেদের দুঃসহ ইউরোপ যাত্রা

১১ দফা প্রস্তাব নিয়ে ইসিতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ

‘প্রধান বিচারপতি ফিরে এসেই কাজে যোগ দিতে পারবেন’

খালেদা জিয়া ফিরছেন আজ

ব্লু হোয়েলের ফাঁদে আরো এক কিশোর

তিন ইস্যু গুরুত্ব পাবে সুষমার সফরে

প্রি-পেইডে সুবিধা বেশি আগ্রহ কম

ভারত থেকে ৩৭৮ কোটি টাকার চাল কিনছে সরকার

ছাত্রলীগ কর্মী মিয়াদ খুন নিয়ে উত্তপ্ত সিলেট

ইস্যু হতে পারে সমস্যার পাহাড়

দ্বিতীয়বার সংসার না করায় খুন

যেভাবে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা, ড্রোন থেকে নেয়া ভিডিও

সিলেটে কাল থেকে পরিবহন ধর্মঘট

ফুটবলকে বিদায় জানালেন কাকা

৩৬তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ