বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

অনলাইন

প্রফেসর আলী রীয়াজ | ১৯ নভেম্বর ২০১৭, রবিবার, ২:৩৯ | সর্বশেষ আপডেট: ২:৪৬
বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে গত কয়েক বছরের সংঘটিত ঘটনাবলি ও প্রবণতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে দুটি বড় ধরনের পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছে। এর একটি হচ্ছে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকট, অন্যটি হচ্ছে রাজনীতি ও সমাজে ধর্মের ব্যাপক প্রভাব। এই ঘটনাবলির প্রেক্ষাপট হচ্ছে বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, যা দেশে একটি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশে সাহায্য করেছে। অতীতে এ কথা তত্ত্বগতভাবে এবং বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা হতো যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্তের বিকাশ একাধিক্রমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে ও সমাজ ও রাজনীতিতে ধর্মের আবেদন হ্রাস করে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কি তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? এই নিবন্ধে বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে কিছু প্রশ্ন তোলা এবং কিছু অনুমান বা হাইপোথিসিস উপস্থাপন করা হয়েছে। এই বিষয়ে গবেষণা ও আলোচনার তাগিদ দেওয়া এই লেখার প্রধান লক্ষ্য, যা বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক চালচিত্র বোঝার জন্য জরুরি, নীতিনির্ধারকদের এবং সমাজ পরির্বতনে আকাক্সক্ষীদের জন্যও এ ধরনের আলোচনা সহায়ক।
কিন্তু এ ধরনের গবেষণা ও আলোচনার আবশ্যিক শর্ত হচ্ছে পূর্বধারণার বৃত্তে নিজেদের সীমিত না রাখা।

মুখ্য শব্দগুচ্ছ
বাংলাদেশ, প্রবৃদ্ধি, মধ্যবিত্ত, গণতন্ত্র, রাজনীতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

ভূমিকা
আমার এই নিবন্ধের লক্ষ্য হচ্ছে আলোচনার জন্য বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে কিছু প্রশ্ন তোলা এবং কিছু অনুমান বা হাইপোথিসিস উপস্থাপন করা। ফলে আমি এই নিবন্ধে কোনোরকম উপসংহার তুলে ধরার চেষ্টা করব না। বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিকে সামনে রেখে এসব প্রশ্নের উত্থাপন। এসব প্রশ্ন এবং অনুমানের একটি ভিত্তি হচ্ছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কতিপয় তত্ত্ব, অন্য আরেকটি ভিত্তি হচ্ছে বাংলাদেশের চলমান রাজনীতি ও সমাজ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ। ফলে এগুলো যেমন বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা বুঝতে সাহায্য করবে বলে আশা করি, তেমনি এগুলোর দ্যোতনা (ইমপ্লিকেশন) রয়েছে সংশ্লিষ্ট তত্ত্বসমূহের জন্যও।

পটভূমি
বাংলাদেশের রাজনীতি যাঁরা ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করেন এবং গত কয়েক বছরের ঘটনাবলির দিকে যাঁরা নজর রেখেছেন, তাঁদের কাছে এটা স্পষ্ট যে রাজনীতিতে দুটি বড় ধরনের পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছে। এর একটি হচ্ছে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকট, অন্যটি হচ্ছে রাজনীতি ও সমাজে ধর্মের ব্যাপক প্রভাব।
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকট নতুন নয় এই অর্থে যে স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে স্থায়ী রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯০ সালের পর এ অবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও প্রথম দেড় দশকে সাফল্যের মাত্রা আশাব্যঞ্জক ছিল না। ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে অপ্রত্যক্ষ সেনাশাসনের সূচনায় অনেকেই এই আশঙ্কা ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে ফিরে যাবে। যাঁরা ঘটনাবলিকে দীর্ঘ মেয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখেন, তাঁদের এই আশঙ্কার কারণ কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসই ছিল না, ছিল বাংলাদেশের বাইরের অভিজ্ঞতাও। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন যে কোনো দেশে ভঙ্গুর গণতন্ত্র থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। ‘ভঙ্গুর গণতন্ত্র’ থেকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের উত্থানের আশঙ্কাই বেশি। সেই প্রেক্ষাপটে এবং বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই রকম মনে করা হতে থাকে যে সামরিক কর্তৃত্ববাদের পথেই দেশটি অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু অচিরেই এটা বোঝা যায় বাংলাদেশে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে না। ২০০৮ সালের শেষে একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে বেসামরিক নির্বাচিত সরকার তৈরি হয়। ধরে নেওয়া হয় যে বাংলাদেশ কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু সংবিধানের পরিবর্তন এবং ক্ষমতাসীন দলের আচরণ ভিন্ন রকম ইঙ্গিত দিতে থাকে। ২০১৪ সালে প্রায় সব বিরোধী দলের বর্জন সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দল এককভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন করে, যার ফলে সংসদে বিরোধী দলের কোনো অস্তিত্বই নেই (নির্বাচনের আগের ও নির্বাচনের সময়কার রাজনৈতিক অবস্থার জন্য দেখুন, রীয়াজ ২০১৪)। ওই নির্বাচনের আগে এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দল এমন সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বা মর্মবস্তুর দিক থেকে গণতান্ত্রিক বলে বিবেচিত হতে পারে কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষ। বাংলাদেশের ইতিহাস বিবেচনা করলে দেখা যায় যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল বাণীটি ছিল গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তিনটি ভিত্তি¬ -মানবিক মর্যাদা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার-তার সারবস্তু হচ্ছে সব নাগরিকের সমতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের নিশ্চয়তা। এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে দেশ স্বাধীন হলেও বাংলাদেশে গণতন্ত্র শুধু প্রাতিষ্ঠানিক রূপলাভেই ব্যর্থ হয়েছে তা নয়, এখন প্রশ্ন উঠছে কয়েক দফা কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিজ্ঞতার পরও দেশটি আবার সেই পথেই যাত্রা শুরু করেছে কি না।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি গবেষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এবং ২০১৭ সালে এসে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি-বিষয়ক আলোচনায়, তা গণমাধ্যমেই হোক কি নীতিনির্ধারক পর্যায়েই হোক, বারবার আলোচিত হচ্ছে তা হলো সমাজ ও রাজনীতিতে ধর্মের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। ১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানে ‘সেক্যুলারিজম’কে (যাকে সংবিধানের বাংলা ভাষ্যে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বলা হয়) রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা এবং ধর্মভিত্তিক সংগঠন তৈরির ওপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে এই ধারণাই পাওয়া গিয়েছিল যে রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়েছে এবং সেই নিষ্পত্তি হচ্ছে: এই দুইয়ের মধ্যে দেয়াল তুলে দেওয়া গেছে, রাজনীতি ও সমাজে ধর্মের প্রত্যক্ষ প্রভাবের অবসান করা গেছে। কিন্তু সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে ক্রমান্বয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অপসারিত হয়, রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে সেক্যুলারিজমের/ধর্মনিরপেক্ষতার অবসান হয়, রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলের আবির্ভাব ঘটে, রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং দল-নির্বিশেষে ধর্মীয় প্রতীক ও রেটরিক ব্যবহৃত হতে থাকে। নব্বইয়ের দশকে কেবল যে রাজনীতিতেই ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পায় তা নয়, সমাজে ও দৈনন্দিন জীবনাচরণে ধর্মের ব্যাপক এবং দৃষ্টিগ্রাহ্য উপস্থিতি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। ইসলামপন্থী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন ধরনের ইসলামপন্থী দলের- সংস্কারবাদী, রক্ষণশীল, উগ্রপন্থী, সহিংস চরমপন্থী- বিকাশ লাভ করে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হলেও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল থেকেছে এবং ধর্মের প্রশ্নে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার কোনো লক্ষণই আর উপস্থিত নেই। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ধরনের ইসলামপন্থি জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি ঘটতে শুরু করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে সমাজজীবনে ইসলামের উপস্থিতি। বাংলাদেশের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে যে স্থানীয় ও সমন্বয়বাদী (সিনক্রেটিক) ইসলামের প্রাধান্য ও প্রভাব ছিল বলে ধারণা করা হতো, তার পরিবর্তে একটি আক্ষরিক (লিটারালিস্ট) ও বৈশ্বিক ব্যাখ্যার ইসলামেরই প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এবং তা ক্রমবর্ধমান।
এই দুই প্রপঞ্চের উপস্থিতির প্রেক্ষাপট হচ্ছে একটি পরিবর্তনশীল দেশ ও রাষ্ট্র। ঊনিশ শ’ একাত্তর সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উদ্ভবের পর ৪৬ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজে পরিবর্তন ঘটেছে। রাষ্ট্রগঠন একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া, ফলে পরিবর্তন এখনো অব্যাহত আছে এবং তা অস্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের পরিবর্তনের কথা উঠলেই যেটি কমবেশি সবাই প্রথমেই বলেন তা হচ্ছে এর অর্থনীতির পরিবর্তন- একসময় যে দেশটি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’তে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল এটি একটি ‘উন্নয়নের পরীক্ষাগার’, সেই দেশটি এখন অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনার দেশ বলে বিবেচিত হচ্ছে। প্রাইসওয়াটারহাস কুপারের হিসাব অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ পৃথিবীর ২৮তম বৃহৎ এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে। মোট অর্থনীতির আকার দাঁড়াবে ৬২৮ বিলিয়ন ডলার থেকে যথাক্রমে ১৩২৪ বিলিয়ন ডলার এবং ৩০৬৪ বিলিয়ন ডলার (জামাল, ২০১৬)।
আমার আলোচনার পটভূমি হচ্ছে এই তিনটি দিক- বড় আকারের বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক সাফল্য, সামাজিক ক্ষেত্রে ধর্ম, অর্থাৎ, ইসলামি ভাবধারার ব্যাপক বিস্তার এবং রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্রমাগত সংকোচন। আমার লক্ষ্য হচ্ছে, এই তিন দিকের মধ্যকার সম্পর্কের কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা এবং প্রশ্ন উত্থাপন করা। (চলবে)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

দাউদ

২০১৭-১১-১৯ ০২:২৫:৩৫

আলী রিয়াজ রেন্ড কর্পোরেশনের অধীনে কাজ করা পন্ডিত লোক । আমেরিকার "সন্ত্রাসবাদ" গবেষণা প্রকল্পের তিনিও গুরুত্বপূর্ণ বরকন্দাজ!

আপনার মতামত দিন

ভারতে তিন তালাক বিরোধী খসড়া আইনে সরকারের অনুমোদন

বিরোধীরা আসলেই কাগুজে বাঘ: মোজাম্মেল হক

গাংনী বিএনপি কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ

বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ হতে পারে স্পেন!

মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়ে দুইয়ে শেখ জামাল

সারা দেশে বিএনপির প্রতিবাদ কর্মসূচি ১৮ ডিসেম্বর

যেভাবে অপহরণকারীদের হাত থেকে মুক্ত হলেন সিলেটের ব্যবসায়ী মুন্না

মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে প্রেসিডেন্টের শোক

সানি লিওন শাড়ি না পরলে গণ আত্মহত্যার হুমকি!

রাজধানীতে লাগেজে মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার

‘সাধারণ মানুষের রাজনীতি করতেন মহিউদ্দিন চৌধুরী’

মন্ত্রিত্বের প্রস্তাবেও না বলেছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী

সারাদেশে আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে

বিজয় দিবস অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন ৩০ জন ভারতীয়

প্রেমিকের সঙ্গে দেখে ফেলায়...

কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩